ফিচার

কৃষক বাবার ছেলে শরিফুলের উঠে আসার গল্পটা সহজ ছিলনা

নিউজ ডেস্ক

১৭ জানুয়ারী ২০২১, সকাল ৯:৬ সময়

[ 1610873876748 ]
সম্পাদিত ছবি
পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক বাবার সন্তান শরিফুল ইসলাম। সংসার চালানোতেই হিমসিম খেতেন যিনি, এমন পরিবারের সন্তান ক্রিকেটার হবেন তাতো বিলাসিতা বৈকি? তবে কৃষক বাবাকে আকাশ ছোয়ার স্বপ্নটা প্রথমে শরিফুলই দেখিয়েছিলেন। যেটি পরে মেনেও নিয়েছিলেন তার বাবা দুলাল মিয়া। সংসার চালাতে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া বাবার সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা আনতেই ছোট বেলায় বড়শি নিয়ে খালে-বিলে মাছ ধরতে যেতেন শরিফুল। বড়শিতে টোপ গাথানো হ্যাংলা পাতলা ছেলেটা কখনোই ভাবেননি একদিন বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন সাকিব-তামিমদের সাথে। শরিফুলের বাবাও দিয়েছেন সমর্থনও। বাপ-পুতের আকাশ জয়ের স্বপ্ন আর চেষ্টাই মসৃণ করেছে শরিফুলের জাতীয় দলে উঠে আসার কাটা বিছানো পথটা। ২০১৬ সালের ঘটনা, তখনো ক্রিকেটার হওয়ার ভাবনাই ছিল না শরিফুলের। ক্রিকেট টা শুধুমাত্র খেলতেন অন্যের দেখাদেখি আর ভালো লাগা থেকেই। [caption id="attachment_1296" align="alignnone" width="700"] ছবিঃ একুশে টিভি[/caption] ২০১৬ সালে স্থানীয় এক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে টেপ টেনিসে তাঁর বল দেখে মুগ্ধ হন রাজশাহীর স্বনামধন্য কোচ আলমগীর কবির। দীর্ঘদিন ধরে যে কাথা শরিফুল বুনেছেন, সেদিনই মূলত প্রথম ফোড়টা তুলেছিলেন তিনি। সেখান থেকেই আলমগীর কবিরের ডাকে পঞ্চগড় থেকে রাজশাহীতে আসেন শরিফুল। তাইতো শরিফুল কখনই ভুলতে পারেন না তার শৈশবের কোচ আলমগীর কবিরকে। যখন যেখানে গিয়েছেন বারবার বলেছেন, তার ক্রিকেট খেলার সরঞ্জামাদিই ছিলনা, তাকে এক জোড়া বুট দিয়েছিলেন এই কোচই। শরিফুল বলেন, "আমার খেলার কোনও সরঞ্জাম ছিল না। তিনিই আমার হাতে ভারত থেকে আনা একজোড়া নতুন বুট তুলে দেন। সকালে শুধু আমাকে নিয়েই একটা আলাদা প্র্যাকটিস সেশন রাখতেন। বিকেল বেলা যত্ন নিতেন নিজের সন্তানের মতো।" এরপরই একজন পেশাদার ক্রিকেটার হবার লক্ষ্য নিয়ে শরিফুল চলে আসান ঢাকায়। কিন্তু ছিল না খরচ চালানোর মত অর্থ। যেখানে নিজেরই চলার মত অর্থ ছিল না সেখানে শরিফুলের ছিল বাড়িতে বাবা-মাকে দেখা শোনা করার দায়িত্ব। অনেক সময় না খেয়ে কাটিয়ে দেয়া শরিফুল যখন খেলতে গিয়ে হাপিয়ে উঠতেন, তখন বাধ্য হয়ে হয়ে টাকার জন্য ফোন করতেন বড় ভাইকে। গার্মেন্টস কর্মী দারিদ্র বড় ভাই অনেক কষ্টে ২০০-৩০০ টাকা পাঠাতেন শরিফুলকে। শরিফুলের বড় ভাই আশরাফুল এই অভাবনীয় কষ্টের দিনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একটি পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আশরাফুল বলেন , "আমার ভাই অনেক কষ্ট করে এই জায়গায় এসেছে। অভাবের সংসারে তাকে কিছুই দিতে পারিনি আমরা। পুরোপুরি সমর্থন দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না আমাদের।" শরিফুলের ক্রিকেট প্রেম দেখে এক সময় বড় ভাইও শুরু করেন ক্রিকেট খেলা। এরপরই কাটতে থাকে শরিফুলের দুঃসময়। তার আক্লান্ত পরিশ্রম দেখে ভাগ্য বিধাতাও পারেননি মুখ ফিরিয়ে নিতে। এই দারিদ্রতাই তাকে মহান বানিয়েছে। [caption id="attachment_1294" align="alignnone" width="600"] ছবিঃ ক্রিকইনফো[/caption] প্রিমিয়ার লিগে প্রথম সকলের নজরে আসে শরিফুল। ৮ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে আসরে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হন তিনি। ওই সাফল্যই খুলে দেয় শরিফুলের বিপিএল ও বাংলাদেশ ‘এ’ দলের দরজা। তার পর অ-১৯ দলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতানোতে শরিফুলের অবদান আর পরের গল্পটা সবারই জানা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতিয়ে নিয়মিত আলোচনায় ছিলেন বাঁহাতি এই দীর্ঘাকায় পেসার। এর পর বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপে নজর কাড়া পারফর্ম্যান্স দেখে আর মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেননি নির্বাচকরা। সুযোগ পেয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের জাতীয় দলে। অপেক্ষায় আছেন স্বপ্নের অভিষেকেরও। দুঃসময় কাটিয়ে ক্রিকেট দিয়ে আয় করা টাকায় ভূমিহীন কৃষক বাবাকে করে দিয়েছেন গরুর খামার। এক সময় পান্তা ভাতে মরিচ মেখে খাওয়া শরিফুলের ভাগ্য বদলে দিয়েছে তার প্রতিভা আর আক্লান্ত পরিশ্রম।