ফিচার

ডেনিস ল' : বিখ্যাত হলি ট্রিনিটির অবিচ্ছেদ্য অংশ

নিউজ ডেস্ক

১৭ জানুয়ারী ২০২১, দুপুর ১১:৩৭ সময়

[ received_1292899224418341 ]
ছবিঃ ইন্টারনেট
হলি ট্রিনিটি বলতে জর্জ বেস্ট, স্যার ববি চালটন এবং ডেনিস ল' ইংলিশ ফুটবল ইতিহাসের গ্রেটেস্ট ট্রায়োকে বুঝায় যারা সবাই ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল ক্লাব ম্যান ইউনাইটেডের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাদের মধ্যে জর্জ বেস্ট এবং স্যার ববি চার্লটন বর্তমান প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও অনেকে হয়ত ডেনিস ল'কে চিনেন না। কিংবা তাকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনাও হয় না। অথচ যখন জানতে পারবেন, থিয়েটার অব ড্রিমে এখন পর্যন্ত মাত্র একজন ফুটবলারের দুই দুটো স্ট্যাচু রয়েছে এবং সেই মানুষটি হল, ডেনিস ল' তখন নিশ্চয়ই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তার অবদান সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবেন। আজকে কথা বলব, ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডে প্রথম এবং একমাত্র স্কটিশ ব্যালন ডি'অর জয়ী ফুটবলার ডেনিস ল'কে নিয়ে। [caption id="attachment_1352" align="alignnone" width="640"] ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিন শহরের এক কৃষক পরিবারে জন্ম ডেনিস ল'র। বাবার নাম জর্জ ল'; এবং মা রবিনা। সাতভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ভাই ডেনিস ল' এর শৈশব কাটে বেশ দারিদ্রতার মধ্য দিয়ে। ১২ বছর বয়সে প্রতিবেশীর কাছ থেকে পান একজোড়া সেকেন্ড- হ্যান্ড বুট উপহার। সেই স্কুল জীবন থেকে ডেনিস ল' নিজের ফুটবল কারিগরি দেখাতে সক্ষম হোন। স্থানীয় স্কুলের ফুটবল দলে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেন। মূলত স্কুল ফুটবল থেকে শহর জুড়ে নজর কাড়েন ডেনিস ল'। একসময় তার দৃষ্টিনন্দন খেলা দেখে হাডার্সফিল্ড টাউনের একজন তাকে ট্রায়ালের ব্যবস্থা করে দেন। ট্রায়ালে এসে ক্লাব ম্যানেজারকে খুব খুশি করতে না পারলেও বিস্ময়করভাবে হাডার্সফিল্ড টাউন ডেনিস ল'কে সাইন করে। ১৬ বছরে ক্লাবের হয়ে অভিষেকও হয়ে যায়। ডেনিস ল' যখন হাডার্সফিল্ড দলে; ম্যাট বসবির ইউনাইটেড তাকে ওল্ড ট্রাফোর্ডে আনার চেষ্টা করেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে তখন আবার প্রতিযোগিতায় নামে রাইভাল লিভারপুল। লিজেন্ডারি কোচ বিল শ্যাংকলি সেসময় হাডার্সফিল্ড টাউনের এর কোচ হওয়ায় অনেকে প্রায় ধরেও নিয়েছিল ডেনিস ল' হয়তো লিভারপুলে আসছে। কিন্তু, কোন এক অজানা কারণে সেবার ডেনিস ল'কে দলে ভেড়াতে ব্যর্থ হয় এই দুটো ক্লাবই; ডেনিস ল' চলে যায় ম্যানচেস্টার সিটিতে। ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ রেকর্ড ট্রান্সফারে ডেনিস ল' ম্যান সিটির সঙ্গে চুক্তি করেন। প্রসঙ্গত, সেবারই অল্পের জন্য দ্বিতীয় বিভাগে অবনমন ঠেকায় সিটিজেনরা। ইংল্যান্ডে লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে অভিষিক্ত হয় ডেনিস ল'র। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে এক মৌসুম খেলেই যখন ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ; এফএ কাপে লুটন টাউন-এর বিপক্ষে এক ম্যাচে ছয় গোল করে সিটিজেনদেরও আফসোস আরও বাড়িয়ে দেন। যদিও ম্যাচটি স্থগিত হওয়ায় ডেনিস ল'এর ক্যারিয়ারে আর এই ছয় গোলের কাউন্ট করা হয়নি। পরবর্তীতে ম্যাচ পুনরায় হলে ম্যান সিটিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে পরবর্তীতে রাউন্ডেও উঠে যায় লুটন। ডেনিস ল' চলে যান ইতালিতে। '৬১ সালে আবারও ব্রিটিশ ট্রান্সফারের রেকর্ডে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে ইতালিয়ান ক্লাব তুরিনোতে যোগ দেন ডেনিস ল'। এবারও ল'কে দলে ভেড়ানোর রেসে ইতালিয়ান জায়ান্ট ক্লাব ইন্টার মিলান আসে। কিন্তু, জো বাকেরের পরামর্শে তার ঠিকানা হয় তুরিনো!! [caption id="attachment_1343" align="alignnone" width="803"] ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] ইতালির ফুটবল ঐতিহ্যগতবভাবেই রক্ষনাত্মক আর কাউন্টার এটাকিং বেইজ ফুটবল এবং ইতালির মাঠে তখন আল্ট্রা ডিফেন্সিভ ফুটবল সিস্টেম 'কাতেনেচ্চির' জয়জয়কার। ইতালির মাটিতে গোল করা ছিল সোনার হরিণের ন্যায়। দুনিয়ার সেরা সব স্ট্রাইকার এসে এখানে গোলের জন্য হাপিত্যেশই করতে হত। তাই শুরু থেকেই ডেনিস ল'র তুরিনোর হয়ে মানিয়ে নিতেও কষ্ট হয়।। ল' কোনভাবেই এই সিস্টেমের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। তারপরও ডেনিস ল' ফিওরিন্টিনা দলের কার্ট হামরিন ও ইন্টার মিলানের তারকা মিডফিল্ডার লুইস সুয়ারেজকে ছাড়িয়ে নিজেকে ইতালির সেরা বিদেশী ফুটবলার হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। একদিন বন্ধু জো বাকারকে নিয়ে বাহির হলে ; রাস্তায় দুজনই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। গাড়ি দুর্ঘটনায়ে আহত হয় জো বাকার। এই একটি দুর্ঘটনায় ডেনিস ল'র ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপটও পরিবর্তন হয়ে যায়। পরের মাসেই তিনি ক্লাব তুরিনোকে ট্রান্সফারের জন্য অনুরোধ করেন। প্রথম প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ঠিকই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন। বলা হয়ে থাকে, ডেনিস ল' র ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগদান করা ইংলিশ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা যুগান্তকারী ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি। বিমান ক্রাশের দুর্ঘটনায় ইউনাইটেড যখন বিধ্বস্ত; ম্যাট বসবির দলে আসেন ডেনিস ল'। আগে থেকে দলে ছিলেন স্যার ববি চার্লটন; তারপর জর্জ বেস্ট আসলে ইউনাইটেডে গড়ে তুলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা ত্রিফলা আক্রমণ। যে ত্রয়ীর মূল স্কোরার ছিলেন ডেনিস ল'। ১৯৬২ সাল ১৮ই আগস্ট, ওয়েস্ট ব্রোমিচের অ্যালবিউনের বিপক্ষে ডেব্যু হয় ডেনিস ল'র; মাত্র সাত মিনিটে গোলের খেরোখাতা খুলে ফেলেন। ফার্স্ট ডিভিশনে লেস্টার সিটির বিপক্ষে ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাট্রিক করেন। এফএ কাপে নিজের শৈশবের ক্লাব হাডার্সফিল্ড টাউন দলের বিপক্ষে দারুণ এক হ্যাট্রিক করে ইংলিশ মিডিয়ায় ঝড় তুলেন। হ্যাঁ, সেই বছরই দীর্ঘদিনের বান্ধবী ডায়নাকে বিয়ে করে সংসার জীবনও শুরু করেন তিনি। পরের মৌসুম ছিল ডেনিস ল'র ক্যারিয়ারে সেরা বছর। মৌসুমের শুরুটা করেন ওয়েম্বলিতে বিশ্ব একাদশ বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যেকার ম্যাচ খেলে। ডেনিস ল'এর শেষ মুহূর্তের গোলে বিশ্ব একাদশ ইংল্যান্ড দলকে হারায় ১-০ গোলে। এ মৌসুমে সবমিলিয়ে গোল করেন ক্লাবরেকর্ড ৪৬টি। ১৯৬৪-৬৫ মৌসুমে লীগে গোল করেন সর্বোচ্চ ২৮টি ; মিউনিখ ডিজাস্টারের পর ম্যান ইউনাইটেডও জিতে প্রথমবারের মত লীগ টাইটেল। ডেনিস ল' সেবার ইন্ডিভিচ্যুয়ালি প্রথম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্লেয়ার ও একমাত্র স্কটিশ ফুটবলার হিসেবে জিতেন ব্যালন ডি' অর। এর মাঝে স্কটল্যান্ডের হয়ে খেলতে গিয়ে পোল্যান্ড দলের বিপক্ষে মারাত্মক এক ইঞ্জুরিতে পড়েন যা তার পুরো ক্যারিয়ারে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। এক ইঞ্জুরিতেই ল' প্লেয়িং স্টাইল চেঞ্জ করতে বাধ্য হয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে পরের মৌসুম নানা নাটকীয়তার মধ্যে খেলতে হয় ল'কে। অবশ্য তার জন্যও দায়ী ডনিস ল' নিজেই। ৬৫'তে ব্যালন জিতার পর ডেনিস ল' যখন ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা; ঠিক তখনই ইউনাইটেড বস ম্যাট বসবির সাথে জড়িয়ে পড়েন এক দ্বন্ধে। একসময় ম্যাট বসবি ডেনিস ল'কে উদ্দেশ্য করে বলে ফেললেন: ' No player will hold this club to ransom, no player !' আউট অব দ্য ফিল্ডে অনেক কিছু হলেও মাঠের পারফরম্যান্স ডেনিস ল'র একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। এই মোসুমে ৩৬ ম্যাচে ২৩ গোল করে ইউনাইটেড রে জিতান লীগ ট্রফি। . ১৯৬৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রথম ইউরোপ সেরা হওয়া দলের গ্লোরি মেম্বারদের তালিকায়ও থাকত ডেনিস ল'এর নাম। কিন্তু, মারাত্মক ইঞ্জুরিতে পড়ে মিস করে সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ম্যাচ। তারপর থেকে প্রতিদিনই তাকে নিতে হয় কর্টিসন ইনজেকশন।। ম্যান ইউনাইটেড দলের মেডিক্যাল দলের ভাষ্যমতে,"ডেনিস ল'এর ইঞ্জুরি এতটা ভয়াবহ ছিল যে যেকোন সময় পঙ্গু হয়ে যেতে পারতেন।' কিন্তু, অনিশ্চিত জীবনের কথা না ভেবে তিনি খেলে গিয়েছিলেন ইউনাইটেড দলের হয়ে। পরের মৌসুমেই ইউরোপীয়ান কাপে করেন সর্বোচ্চ নয় গোল। কোচ Wilf McGuinness এর অধীনে ইঞ্জুরির জন্য লীগে খেলতে পারেননি একটি ম্যাচও। ইউনাইটেড দলও লীগ শেষ করে অষ্টম হয়ে। তারপর ইঞ্জুরির জন্য কখনো আর দলে নিয়মিত হতে পারেননি। ম্যানচেস্টার সিটির কোচ যখন জনি হার্ট ; ডেনিস ল'কে অফার করে সিটি। ঠিক পরের মৌসুমে ওল্ড ট্রাফোর্ড ছেড়ে আবার যোগ দেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। তার আগে ইউনাইটেড দলের হয়ে ১১ মৌসুমে সবমিলিয়ে ৪০৪ টি ম্যাচ খেলে গোল করেন ২৩৭টি। রেড ডেভিলদের হয়ে কেবল স্যার ববি চার্লটন এবং ওয়াইন রুনিই ডেনিস ল' থেকে বেশি গোল করতে পেরেছেন। ম্যান ইউনাইটেডের ইতিহাসের সর্বোচ্চ হ্যাট্রিকের মালিক এখনও ডেনিস ল'। ১৯৬৪ সালে এক মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ল' এর ৪৬ গোলের রেকর্ড এখনও ব্রেক করতে পারে নাই কোন ইউনাইটেড ফুটবলার। . ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ওল্ড ট্রাফোর্ডে দুইটি স্ট্যাচু স্থাপন করেছে। যার একটি আছে স্ট্রেটফোর্ডের শেষ প্রান্তে; অন্যটি আছে বিখ্যাত হোলি ট্রিনিটিতে। ইউনাইটেডের প্রতি আনুগত্যের জন্য সমর্থকরা তাকে ভালোবেসে নাম দিয়েছিল ' দ্য কিং' বা 'দ্য ল'ম্যান'। অত্যন্ত চাপা স্বভাবের জর্জ বেস্ট যে'কজন ফুটবলারের প্রসংশা করেছেন ডেনিস ল' তাদের মধ্যেও একজন। জর্জ বেস্ট তাকে বর্ণনা করেন ঠিক এভাবে, “Up there with the all-time greats. Electric. As a bloke and as a pal he’s different class.”