ফিচার

ব্যাটল অব বার্ন: বিশ্বকাপ ইতিহাসের জঘন্যতম ম্যাচ

নিউজ ডেস্ক

৯ মে ২০২১, দুপুর ১:৮ সময়

[ getting-their-kicks-sandor-kocsis-shoots-as-castilho-moves-in-for-the-save ]
সান্দোর কোকসিসের শট সেভ করার জন্য এগিয়ে আসেন কাস্তিলহো। ছবিঃ ইন্টারনেট
"ভেবেছিলাম এটাই হবে আমার দেখা সেরা ফুটবল ম্যাচ। আফসোস এটা হয়ে গেল একটা কলঙ্ক। মাঠের মধ্যে তাদের আচরণ ছিল যেন পশুর মত।" ১৯৫৪ এর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল ও দ্যা ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স হাঙ্গেরীরর ম্যাচ সম্পর্কে কথাটি বলেছিলেন লিজেন্ডারি ইংলিশ রেফারী আর্থার এলিস। ম্যাচটির পরিচালনার দায়িত্বেও তিনিই ছিলেন। একটি ম্যাচ যেখানে দুই দলের ৬টি গোল, ৪২টি ফ্রিকিক, ২টি পেনাল্টি এবং তিনটি লালকার্ড দেখানো হয় সেই ম্যাচ সম্পর্কে তারচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা হয়তো আর কেউ দিতে পারেনি। একদিকে ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স হাঙ্গেরী আর অন্যদিকে সুন্দর ফুটবল খেলা ব্রাজিল- পুরো পৃথিবীই যখন অপেক্ষা করেছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সুন্দরতম ম্যাচটা দেখার জন্য; তার সমাপ্তিই হয় যেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বিশ্রী, নোংরা এবং জঘন্যতম ম্যাচ হিসেবে। ফুটবলের বিখ্যাত 'Elo rating system' সেরা ম্যাচগুলোর তালিকায় এই ম্যাচের অবস্থান সপ্তম !

২৭ই জুন ১৯৫৪।

সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে প্রায় চল্লিশ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ফুটবল বিশ্বকাপের কোয়ার্টারর ফাইনালে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল এবং হাঙ্গেরী। সেবার বিশ্বকাপের হট ফেভারিট হাঙ্গেরীর 'ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স ' দল শুধু গ্রুপ পর্বেই ১৭ গোল করে (হাঙ্গেরী ৯-০ দ. কোরিয়া; হাঙ্গেরী ৮-৩ জার্মানি)। অপরদিকে আগের বিশ্বকাপে রানার্স-আপ ব্রাজিল গ্রুপ পর্বে তাদের সুন্দর এটাকিং ফুটবল দিয়ে ৬ গোল করে ( ব্রাজিল ৫ -০ মেক্সিকো ; ব্রাজিল ১-১ যুগোশ্লাভিয়া)। দুইদলই ছিল আক্রমণাত্মক ফুটবলের পূজারি; তাই সবাই একটি সুন্দর ম্যাচ দেখার অপেক্ষায় ছিল। টানা ৩২ ম্যাচ অপরাজিত থাকায় পুসকাসবিহীন হাঙ্গেরী দল যেমন জয়ের জন্য খেলতে নেমেছিল ঘরের মাঠ মারাকানায় গেল বিশ্বকাপে নির্মম ট্রাজিডি শিকার ব্রাজিলও জয়ের জন্য মরিয়া ছিল। [caption id="attachment_24688" align="aligncenter" width="636"] সান্দোর কোকসিসের শট সেভ করার জন্য এগিয়ে আসেন কাস্তিলহো। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] আক্রমণাত্মক দু'দলের সুন্দর ফুটবল যে বাধাগ্রস্থ হবে তা ম্যাচের শুরুতে বৃষ্টির হানা কিছুটা ইঙ্গিতও দিচ্ছিল। সেদিন বৃষ্টির কারণে মাঠ ছিল খুবই পিচ্ছিল এবং বল নিয়ন্ত্রণ করা দুই দলের জন্যেই ছিল দুরহ! খেলা শুরুর মাত্র ৩ মিনিটের মধ্যেই নানডর হাইডেকগুতির গোলে এগিয়ে যায় হাঙ্গেরী। তার মাত্র ৪ মিনিট পরেই সানডর ককসিসের গোলে হাঙ্গেরি তাদের লিডটা দ্বিগুণ করে। ৭ মিনিটেই ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর গোলশোধে মরিয়া হয়ে উঠে সেলেসাওরা। ১০ মিনিট পর পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান ২-১ এ কমিয়ে আনে ব্রাজিল সেন্টার-ব্যাক দিলমা সান্তোস। গোল পেয়েই যেন নতুন উদ্যমে জেগে উঠে ব্রাজিল; একের পর এক আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত রাখে হাঙ্গেরীর ডিফেন্স। কিন্তু, এসময় আর কোন গোল না হলে ২-১ গোল লীড নিয়ে প্রথমার্ধ শেষ করে হাঙ্গেরী ! [caption id="attachment_24689" align="aligncenter" width="620"] হাঙ্গেরি এবং ব্রাজিল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা পাওয়ার জন্য লড়াই করে। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] দ্বিতীয়ার্ধ শুরুটা হয় বাজেভাবেই। শুরুতেই ব্রাজিলের জুলিনহোকে মারাত্মক ট্যাকল করেন হাঙ্গেরীর লরান্তে। ম্যাচের ষাট মিনিটেই হাঙ্গেরি একটি বিতর্কিত পেনাল্টি পায়- যা পুরো মাঠ উত্তপ্ত করে তুলে। এই পেনাল্টি ঘিরে প্লেয়াররা এবং সাংবাদিকরাও মাঠে ঢুকে ঝামেলা করা শুরু করে। পরিবেশ এতটাই বাজে ছিল, সবাইকে শান্ত করতে শেষ পর্যন্ত পুলিশকেও নামতে হয়। পরে পুলিশ ও রেফারীরর হস্তক্ষেপেই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে এনে খেলা আবার শুরু হয়। যদিও, খেলোয়াড়দের ক্ষোভ প্রশমনে তা যথেষ্ট ছিল না! মূলত ওই ঘটনার পর ম্যাচের দৃশ্যপট পাল্টে যাওয়া শুরু হয়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতেও এত সুন্দর ফুটবল খেলা দুটি দল মারাত্মক সব ট্যাকলে ব্যস্ত হয়েই পড়ে। ২৮ শে জুন বিখ্যাত দ্য টাইমসের এক সাংবাদিক প্রতিবেদনে লিখেন,

"এত নিষ্ঠুর ট্যাকল আমি আগে দেখিনি...."

ওই পেনাল্টি থেকে গোল করে হাঙ্গেরীকে ৩-১ এগিয়ে নিয়ে যায় লান্তোস। তার পাঁচ মিনিট পরই জুলিনহোর গোলে লীড কমায় ব্রাজিল। স্কোরলাইন হয় হাঙ্গেরী ৩- ২ ব্রাজিল! খেলার মেয়াদ যখন ৭১ মিনিট; ম্যাচের সব চেয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায় এই সময়। ব্রাজিলের খেলোয়াড় নিলটন সান্তোসকে মারাত্মক ট্যাকল করেন হাঙ্গেরীর জোসেফ বজসিক। ঘুষাঘুষি শুরু বজসিক ও সান্তোস। রেফারী দুই জনকেই লাল কার্ড দেখায়। তার মাত্র ৮ মিনিট পর আবারও লালকার্ড! এবার লরান্তকে লাথি মেরে সরাসরি লালকার্ড খেয়ে মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল প্লেয়ার হাম্বার্তো তোজ্জি। [caption id="attachment_24690" align="aligncenter" width="700"] মাঠের মধ্যেই সংঘর্ষ বাধে ব্রাজিল ও হাঙ্গেরী। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; ম্যাচের আটাশিতম মিনিটে ককসিসের গোলে হাঙ্গেরীর জয়ই নিশ্চিত হয়। হাঙ্গেরী ম্যাচ ৪-২ গোলে জিতে নেয়। ম্যাচ শেষ ড্রেসিংরুমেও দুই দল আরেক দফা মারামারি করে বসে! সেখানেও পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এভাবেই যে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা ম্যাচ তা হয়ে গেল বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই সবচেয়ে লজ্জাজনক ম্যাচগুলোর একটি। ম্যাচ রিপোর্টে রেফারী আর্থার এলিস করুণভাবেই লিখেন,
"I thought it was going to be the greatest game I'd ever see. I was on top of the world. Whether politics and religion had something to do with it I don't know, but they behaved like animals. It was a disgrace. It was horrible match. Today's climate so many players would have been sent off the game would have been abandoned. My only thought was that I was determined to finish it."
তিনি মোটেও মিথ্যে বলেননি। ম্যাচের ভয়াবহতা এতটা বেশি ছিল যে দুই দলের প্লেয়ারদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মাধ্যমেই মাঠের বাহিরে নিয়ে আসতে হয়। ঘটনার রেশ দুই দেশের ডিপ্লোমেটিক সম্পর্কের মধ্যে গিয়েও ঠেকে। টানা দুইটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এমন করুণ বিদায় সে দেশের ফুটবলে অন্ধকার নেমে আসে- যা পরে পেলের মাধ্যেমে কাটিয়ে উঠে। ফুটবল ইতিহাসে ম্যাচটি ' ব্যাটল অব বার্ন' নামে সর্বাধিক পরিচিত। লেখা: এ.এইচ বাদশা