ফিচার

২০০৫ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালঃ দ্যা মিরাকল অব ইস্তাম্বুল

নিউজ ডেস্ক

২৫ মে ২০২১, দুপুর ৩:৫৬ সময়

[ 20210525_212437 ]
এমন প্রত্যাবর্তন ইউরোপসেরার আসরে আর হয়নি কখনও। ছবিঃ ইন্টারনেট
আচ্ছা হঠাৎ করেই কোন আগুন্তক যদি আপনাকে এই দুইটি প্রশ্ন করে বসে;  (ক) উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ ইতিহাসে সেরা ম্যাচ কোনটি? (খ) চ্যাম্পিয়নস লীগ ইতিহাসের সেরা ফাইনাল ম্যাচ কোনটি? আপনার কাছে কোন প্রশ্নটি সহজ মনে হবে? সম্ভবত শেষের প্রশ্নটিই তুলনামূলক সবচেয়ে সহজ হবে। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আপনি লিভারপুল ৩-৩ মিলান, বার্সেলোনা ৬-১ পিএসজি, লিভারপুল ৪-০ বার্সেলোনা, রোমা ৩-০ বার্সেলোনা, ম্যান ইউনাইটেড ২ -১ বায়ার্ন মিউনিখ কিংবা রিয়াল মাদ্রিদ ৪-১ এটিএম এই রকম অনেকগুলো যুগান্তকারী ম্যাচের কথা আপনার মাথায় চলে আসবে। তাই প্রশ্নটা হয়তো একটু কঠিনও বলা যেতে পারে। কিন্তু শেষ প্রশ্নের উত্তর খুবই ক্লিয়ার। এই প্রশ্নের জবাবে আপনাকে একটা ম্যাচের কথা বলতেই হবে। শিরোনাম দেখেই এতক্ষণে হয়তো বুঝে গেছেন। জ্বী। এখন পর্যন্ত দুনিয়ার বেশিরভাগ ফুটবল এক্সপার্ট, জার্নালিস্ট ও সাবেক লিজেন্ডারি ফুটবলাররা একমত, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসের সেরা ফাইনাল ম্যাচটি হল, ২০০৫ লিভারপুল বনাম এসি মিলান ম্যাচ। ফুটবল ইতিহাসে যা "দ্যা মিরাকল অব ইস্তাম্বুল" নামে পরিচিত। ২০১২ সালে জানুয়ারী মাসে ফুটবলের বিখ্যাত ব্লেচার রিপোর্টে চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসের সেরা দশটি ফাইনাল ম্যাচের একটি তালিকা প্রকাশ করেন। সেখানে এই ম্যাচটি অবস্থান ছিল শীর্ষে। ২০১৯ সালে গোল ডট কম এর রিপোর্টেও ম্যাচটি শীর্ষে ছিল। [caption id="attachment_28658" align="aligncenter" width="1200"] রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে উল্লাসে ফেটে পড়ে অলরেড শিবির। ছবিঃ টুইটার[/caption] রিয়াল মাদ্রিদের ১৩তম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় উপলক্ষে 90min ১৯৯২ থেকে ২০১৯ অর্থাৎ ইউরোপীয়ান কাপের নতুন এডিশন উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের সেরা দশটি ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে রিপোর্ট করেন। সেখানেও দ্যা মিরাকল অব ইস্তাম্বুলের অবস্থান ছিল যথারীতি শীর্ষে। HowTheyPlay রিপোর্টে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসের সেরা ফাইনাল ম্যাচ ছিল এটি। HowTheyPlay ইন্টারনেট পোলেও সর্বকালের সেরা চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল নির্বাচিত হয় ম্যাচটি। কি ছিল না এই একটি ম্যাচে? দারুণ সব গোল, পিছিয়ে যাওয়া, অসাধারণ কামব্যাক, অল্প কিছু সময়ের তান্ডব, টাইব্রেকার, অতঃপর প্রথমার্ধ ৩-০ গোলে এগিয়ে থাকা দলটির নাটকীয় হার সবই ছিল এই একটি ম্যাচেই! ২৫ শে মে ২০০৫। অটোমান সাম্রাজ্যের প্রাণ কেন্দ্র তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বিখ্যাত কামাল আতাতুর্ক স্টোডিয়াম প্রায় ৬৯ হাজার দর্শকের সামনে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইউরোপের প্রভাবশালী দুইদল লিভারপুল ও এসি মিলান। ইউরোপীয়ান কাপের নাম পরিবর্তন হওয়ার পর এটি ছিল লিভারপুলের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল; অন্যদিকে রেকর্ড পঞ্চম ফাইনালে এসি মিলান। [caption id="attachment_28645" align="aligncenter" width="1125"] এমন প্রত্যাবর্তন ইউরোপসেরার আসরে আর হয়নি কখনও। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] আগের বছরই ট্রফি খরা ও ট্রান্সজিশন পিরিয়ডে থাকা লিভারপুলের চেয়ে এই ম্যাচে পরিষ্কার ফেভারিট টিম ছিল পাওলো মালদিনি, আন্দ্রে পিরলো, দিদা, শেভচেঙ্কো, হার্নান ক্রেসপো আর রিকার্ডো কাকাদের গড়া এসি মিলানের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একাদশ। তার উপর মৌসুম শুরু আগেই দলের গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার স্টিভেন জেরার্ডের লিভারপুল ছাড়ার গুঞ্জন ম্যাচের আগেই অলরেডদের খানিকট ব্যাকফুটেও ফেলে দেয়। যদিও কোচ রাফায়েল বেনিতেসের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত জেরার্ড নিজেই ভরা মজলিশে অ্যানফিল্ডে থাকার গ্যারান্টি দিয়ে এই গুঞ্জনের সমাপ্তি টানেন। লিভারপুল অন দ্যা টস এন্ড কিক অফ। ম্যাচ শুরু... হ্যারি কিউয়েল, দিয়েতমার হামান, জাভি আলোন্সো ও স্টিভেন জেরার্ডদের নিয়ে কোচ রাফায়েল বেনিতেজ লিভারপুলকে ৪-৪-১-১ ফর্মেশনে খেলায়। অন্যদিকে পাওলো মালদিনি, আন্দ্রেস পিরলো,থমাসন, রিকার্ডো কাকা ও ক্রেসপোদের লিজেন্ডারি এসি মিলান খেলে ৪-৪-২ ফর্মেশনে। প্রথম মিনিটেই রাইট উইংয়ে কাকাকে ফাউল করে বসেন দিমি ট্রাওরে। আচমকা আন্দ্রেস পিরলোর ফ্রিকিক থেকে চ্যাম্পিয়নস লীগ ইতিহাসে সবচেয়ে বুড়ো বয়সে গোল করে এসি মিলানকে এগিয়ে দেয় ক্যাপ্টেন পাওলেনো মালদিনি। গোলটি অনেকদিন চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে দ্রুততম গোল ছিল এবং এখনও সাত বারের চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়ী দল এসি মিলানের চ্যাম্পিয়নস লীগ ইতিহাসের দ্রুততম গোল। [caption id="attachment_28646" align="aligncenter" width="800"] চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে এসি মিলানের দ্রুততম গোলটি করেন পাওলো মালদিনি। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] এরপর চলতে থাকে এসি মিলানের একচ্ছত্র আক্রমণ। পুরো প্রথমার্ধে এসি মিলানের শক্তিশালী আক্রমণত্রয়ীর সামনে সামান্যতম লড়াইও করার সুযোগও পায়নি বেনিতেসের লিভারপুল। উল্টো ৩৯' এবং ৪৪' মিনিটে আর্জেন্টাইন ক্রেসপোর জোড়া গোলে এসি মিলান ৩-০ গোলের লিড নিলে অনেকে হয়তো এখানেই ইস্তাম্বুল ফাইনালের শেষ দেখে ফেলে! অনেকে হয়তো ধরেই নিয়েছিল, সপ্তমবার ইউরোপ সেরা হতে যাচ্ছে ইতালির রোজোনেরি। বিশ্বব্যাপি লিভারপুল ফ্যানদের লয়্যালিটির একটা বিশেষ কদর আছে। ক্লাব ফুটবলে সেরা ফ্যানবেজের তালিকা করলে অলরেডরা সবসময় সামনের কাতারেই থাকে। তাই ম্যাচে প্রথমার্ধে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও সামন্য হতাশ হয়নি অলরেডরা। মাঠের ফুটবলারদের উৎসাহিত করতে পুরো স্টোডিয়ামে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে অলরেডদের প্রিয় "You'll never walk alone" চ্যান্ট করতে থাকে। [caption id="attachment_28651" align="aligncenter" width="1676"] প্রথমার্ধেই তিন গোলে পিছিয়ে পড়লেও এক মুহুর্তের জন্য লিভারপুল চ্যান্ট বন্ধ করেনি অলরেডরা। ছবিঃ টুইটার[/caption] ফুটবলও এক অনিশ্চয়তার খেলা। সেই খেলায় কখন যে কী ঘটে যাবে তা তাবড় মহারথীদেরও অজানা। এই খেলায় মাঝেমধ্যেই এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা দেখে বিস্ময় কাটে না মাঠে উপস্থিত দর্শকদেরই। তেমনই কিছু বিস্ময়কর মুহূর্ত আসে ইস্তাম্বুল ফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে! ফুটবল দেবতাও যেন এই মূহুর্তগুলো নিজে হাতে সাজিয়ে রেখেছিল এই ম্যাচের শুধু দ্বিতীয়ার্ধের জন্যেই। জাভি আলোনসো আর হামান হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলে। স্টিভেন জেরার্ড এটাকিং মিডে রোল প্লে করে। ফর্মেশন চেইঞ্জ করে লিভারপুল প্লেয়িং স্টাইলও খানিকটা চেঞ্জ করে।   ডিফেন্স ঠিক রেখে কিছু কাউন্টার আক্রমণ করার চেষ্টা করে। তার রেজাল্ট ও আসে হাতেনাতে। খেলার ৯ মিনিট পরই লেফট উইংয়ে রাইসের ক্রস থেকে এসি মিলানের ডি -বক্সে বাস্কেটবল প্লেয়ারের মত লাফিয়ে উঠে স্টিভেন জেরার্ডের লং রেঞ্জে জোরালো হেড! দিদা কিছু বুঝে উঠার আগেই বল চলে গেল গোলবারের ভিতরে। এবং গোওওওওল! কমেন্ট্রিতে থাকা একজন চিৎকার করে উঠলোঃ
"Hello! Hello! Here we go! Steven Gerrard puts a grain of doubt in the back of Milan’s mind and gives hope to all the many thousands of AllRed fans inside the stadium! CAPTAIN’S GOAL!
[caption id="attachment_28653" align="aligncenter" width="1200"] কাপ্তান স্টিভেন জেরার্ডের গোলে বদলে যেতে শুরু করে ম্যাচের চিত্র! ছবিঃ টুইটার[/caption] শুরু হয়ে গেল দ্যা মিরাকল অব ইস্তাম্বুল। ক্যাপ্টেনের গোলে নতুন উদ্যমে জেগে উঠে লিভারপুল। পুরো স্টোডিয়ামে অলরেডদের গগনচুম্বী চিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে উঠে ইস্তাম্বুল। ৫৪' মিনিট থেকে ৬০' মিনিট এই ছয় মিনিটে জেরার্ড, জাভি আলোনসো আর ভ্লাদিমির স্মিতসারের তান্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ততকালীন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী ডিফেন্সটি। মিলানের কোচ কার্লো আনসেলত্তির মতে, এটি ছিল পাগল করা ছয় মিনিট বা 'Six minutes miracle "। প্রথমার্ধে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থাকা লিভারপুলের স্কোরলাইন মাত্র ছয় মিনিটেই ৩-৩ হয়ে যায়। নির্ধারিত সময় শেষ হয় ৩-৩ গোলে সমতা নিয়ে। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে! অতিরিক্ত সময়েও কোন গোল না হলে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে! এসি মিলান ও লিভারপুল দুই দলই শেষ ইউরোপীয়ান কাপ জিতে টাইব্রেকারে। ১৯৮৪ সালে এএস রোমাকে টাইব্রেকারে হারিয়ে চতুর্থবার ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পায় লিভারপুল। অন্যদিকে মাত্র দুই বছর আগেই ওল্ড ট্রাফোর্ডে অল ইতালিয়ান ফাইনালে জুভেন্টাসকে পেনাল্টি শুট-আউটে ৩-২ গোলে হারিয়ে ষষ্ঠবার ইউরোপ সেরা হয় এসি মিলান। [caption id="attachment_28656" align="aligncenter" width="580"] মাত্র ছয় মিনিটেই ৩-০ স্কোরলাইন হয়ে যায় ৩-৩। ছবিঃ টুইটার[/caption] টাইব্রেকে এসি মিলানের হয়ে প্রথমে শট নিতে আসেন ব্রাজিলিয়ান সার্জিনহো। ২০০৩ সালে অল ইতালিয়ান ফাইনালের টাইব্রেকারে প্রথম শট নিয়েই গোল করে ছিলেন সার্জিনহো। কিন্তু এবার প্রথম শটেই তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। লিভারপুলের হয়ে প্রথম শটেই দারুণ ভাবে হয় জার্মান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হামন। তারপর মিলানের হয়ে টাইব্রেক শট নিতে আসে আন্দ্রেস পিরলো। আন্দ্রেস পিরলোর দ্বিতীয় শটটিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ডানদিকের জোরালো শট ঠেকিয়ে দেন জর্জি দুদেক। লিভারপুলের নেওয়া জিব্রেল সিসের ২য় শটটিও সফল হয়। টাইব্রেকে প্রথম দুই রাউন্ডের চারটি শটেই লিভারপুল ২-০ গোলের লিড নেয় ! [caption id="attachment_28657" align="aligncenter" width="630"] আন্দ্রে পিরলোর শট ঠেকিয়ে দিয়ে পেনাল্টি শুট-আউটে নায়ক বনে যান লিভারপুলের গোলরক্ষক জর্জি দুদেক। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] তৃতীয় রাউন্ডে সফল স্পটকিক থেকে গোল করে টাইব্রেকে এসি মিলানকে প্রথম গোল এনে দেয় থমাসন। এই রাউন্ডে লিভারপুলের হয়ে নরওয়ের জন রিস গোল করতে ব্যর্থ হলে টাইব্রেকে স্কোর এসে দাড়ায় ২-১ এ। এসি মিলানের হয়ে চতুর্থ রাউন্ডে শট নেন রিকার্ডো কাকা। সফল স্পটকিকে স্কোর করেন ২-২। এই রাউন্ডে লিভারপুলের হয়ে স্মিতসার গোল করে অলরেডদের ৩-২ গোলে এগিয়ে নেয় ভ্লাদিমির স্মিতসার। এসি মিলানের হয়ে ফাইনাল স্পটকিক নিতে আসেন শেভচেঙ্কো। মাত্র দুই বছর আগেই অল ইতালিয়ান ফাইনালে জিয়ানলুইজ বুফনকে পরাস্ত করে এসি মিলানকে চ্যাম্পিয়ন করেন এই শেভচেঙ্কো। কিন্তু হায়! এবার আর তিনি পারলেন না। শেভচেঙ্কোর সোজাসুজি জোরালো শট ঠেকিয়ে দেন দুদেক!
& The European cup is returning to England and to Anfield, Liverpool FC are champions of Europe again.......
পুরো ম্যাচজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ম্যাচ সেরা হন লিভারপুলের প্রাণভোমরা কাপ্তান স্টিভেন জেরার্ড ওরফে স্টিভি জি! [caption id="attachment_28659" align="aligncenter" width="2048"] ম্যাচসেরা লিভারপুল কাপ্তান স্টিভেন জেরার্ড। ছবিঃ টুইটার[/caption] যুগে যুগে ফুটবলে অনেক থ্রিলিং, অনেক এক্সাইটিং ম্যাচ হয়েছে এবং হচ্ছে তবে ইস্তাম্বুল ফাইনালই সম্ভবত এখন পর্যন্ত ফুটবল প্রেমিদের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ টানতে পেরেছে। তাই এখনও ইস্তাম্বুল ফাইনালের কথা মনে পড়লে ফুটবলপ্রেমিরা নিজের বড় অজান্তেই নস্টালজিক হয়ে যায়। কারণ ফুটবলে ইস্তাম্বুল ফাইনাল একবারই এসেছে। সাধে কি আর প্রয়াত কিংবদন্তি ম্যারাডোনা বলেছিলেন,
"Even the Brazil team that won the 1970 world cup could not have staged a comeback with Milan leading 3-0."
  লেখা: এ.এইচ. বাদশা