অলিম্পিক ফুটবলে সেরা হাঙ্গেরী, পরাশক্তিরা এত পিছিয়ে কেন?

প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জুলাই, ২০২১ | ২০:৪৯:৫৭

ডেস্ক রিপোর্ট

ছবিঃ ইন্টারনেট

জার্মানি দেশটির কথা মনে পড়লেই অজান্তেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠে মেশিন ফুটবলের ধারক ও বাহকদের কথা। যাদের পাওয়ার ফুটবলের কাছে বারবার অপমৃত্যু হয়েছে লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবলও। ইংলিশ ফুটবলার গ্যারি লিনেকারের একটি কথা ফুটবল বিশ্বে বেশ প্রচলিত- “ফুটবল খেলায় ৯০ মিনিট ধরে ২২ জন বলের পেছনে দৌড়ায়, দিন শেষে কেবল জার্মানিই জেতে।” কথাটি যে খুব একটা মিথ্যা নয় সেটি জার্মানির রেকর্ড দেখলেই পরিষ্কার!

ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চারবার (ইতালির সঙ্গে যৌথভাবে) বিশ্বকাপ জেতা দল জার্মানি। জার্মানির মতো বিশ্বকাপ ফাইনালেই উঠতে পারেনি (আটবার) আর কোনো দল । সর্বোচ্চ তেরবার সেমিফাইনালেই খেলেছে তারা! চৌদ্দবার মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে অংশ নিয়ে ৩বার চ্যাম্পিয়ন, তিনবার দ্বিতীয়, তিনবার তৃতীয় হয়েছে জার্মানরা। কনফাডেরশন্স কাপে তিনবার অংশ নিয়ে একবার চ্যাম্পিয়ন এবং তৃতীয় হয় একবার ডাইম্যান শ্যাফটরা।

ব্রাজিলের কথা বললে বিশ্বকাপের কথা মনের অজান্তেই চলে আসে। যে টুর্নামেন্টকে অনেকটা নিজেদের বানিয়ে রেকর্ড পাঁচবার শিরোপা জয়লাভ করেছে সাম্বার দেশটি। পরিসংখ্যান বলছে, ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফলতম দল। সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, সর্বোচ্চ চারবারের কনফাডেরশন্স কাপ, নয়বার কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন।

২০১৬ সালে ঘরের মাঠে নেইমারের নেতৃত্বে অধরা অলিম্পিক স্বর্ণ জিতে ব্রাজিল। ছবিঃ স্কাই স্পোর্টস

ব্রাজিল দুনিয়াজুড়ে সবচাইতে বেশি ফুটবলার রপ্তানি করে। ব্রাজিল ফিফা বর্ষসেরা ফুটবল দল (১৯৯০ থেকে) হয়েছে সর্বোচ্চ ১২বার। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২১বার অংশগ্রহণ করা দল ব্রাজিল (২য় সর্বোচ্চ ১৮বার জার্মানি)। ফিফা র‍্যাংকিং-এ এখন পর্যন্ত ব্রাজিল সর্বোচ্চ ১৪ বার প্রথম, ৬বার ২য় এবং ৩বার ৩য়। ফুটবলে প্রচলিত সর্বজনবিদিত বাক্যটি হল, “ফুটবলের জন্ম দিয়েছে ইংরেজরা, ব্রাজিল সেই ফুটবলের পরিপূর্ণতা দিয়েছে।”

ফুটবলে ব্রাজিল বনাম জার্মানি মানেই যেন একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াই। বিশ্বকাপ কিংবা নিজেদের স্বস্ব মহাদেশে সেরা হওয়ার লড়াই, এ দুদলই থাকে সবার ভিন্ন দৃষ্টিতে৷ অথচ, দুটো দলেরই একটি জায়গায় খুব মিল রয়েছে। সেটা হলো, ফুটবলে চরম আধিপত্য বিস্তারকারী এই দুদল অলিম্পিকে কেবল মাত্র একবারই স্বর্ণপদক জিতেছে।

ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় যে, এখন পর্যন্ত অলিম্পিকে সর্বসাকুল্যে মোট ২৬বার ছেলেদের ফুটবল আয়োজিত হয়েছে। যেখানে ঘরের মাঠে অধরা অলিম্পিক জয়ের আগে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল তিনটি রৌপ্য পদক জয়। ১৯৮৪ সালে ফ্রান্স এবং ১৯৮৮ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ফাইনালে হেরে সোনা জয়ের আশা জলাঞ্জলি দিতে হয়েছিল সেবারের ব্রাজিল দলকে।

২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকেও সোনা জয়ের খুব কাছে চলে গিয়েছিল সেলেসাওরা। কিন্তু শেষ সময়ে এসে খেই হারিয়ে ফেলে। অবশেষে, ২০১৬ সালে নেইমারের নেতৃত্বে ঘরের মাঠে প্রথমবার অলিম্পিক জয়ের স্বাদ নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি।

১৯৭৬ সালে মন্ট্রিল অলিম্পিকে পূর্ব জার্মানি স্বর্ণ জয়ের পর আর কখনও এই পদক জেতা হয়নি ডাই ম্যানশ্যাফটদের। ছবিঃ টুইটার

ব্রাজিল অলিম্পিকের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, আর অন্যদিকে ছোটদের ফুটবল মহারণে জার্মানদের শিরোপা খরা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বার্লিন দেয়াল পতনের আগে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে জার্মানি একবারই স্বর্ণপদক জিতেছে। ১৯৭৬ মন্ট্রিল অলিম্পিক আসরে পূর্ব জার্মানী দল অলিম্পিকে স্বর্ণজয়ের পর আর কখনও ছোটদের খেলায় পদক জেতা হয়নি ডাই ম্যানশ্যাফটদের। ২০১৬ সালে একবার খুব কাছে গিয়েছিল জার্মানি, তবে সেবার টাইব্রেকারে স্বাগতিক ব্রাজিলের কাছে হেরে স্বপ্ন ভাঙ্গে ইউরোপের সফলতম দলটির।

শুধুই কি ব্রাজিল কিংবা জার্মানি? ছেলেদের অলিম্পিক ফুটবলে বড় আফসোস আছে অন্যান্য বড় পরাশক্তিদেরও। বিশ্বকাপজয়ী দলগুলোর মধ্যে ছেলেদের অলিম্পিকে কেবল গ্রেট ব্রিটেন, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে ব্যতীত কোন দলই একবারের বেশি স্বর্ণপদক জিততে পারেনি। “গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ” অলিম্পিকে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি সেরা হয়েছে কেবল একবার, তাও সেই ১৯৩৬ আসরে । ফ্রান্সও পদক জিতেছে একবার, ১৯৮৪ আসরে। এই শতাব্দীতে ফুটবলে বড় প্রভাব বিস্তারকারী দেশ স্পেন জিতেছে একবার, ১৯৯২ সালে।

ছেলেদের অলিম্পিক ফুটবলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ছোটদের মহারণে তুলনামূলক ছোট দলগুলিই বেশ ভালো অবস্থানে আছে। এক সময়ের সাড়া জাগানো ফুটবল দল পেরেঙ্ক পুসকাসদের সেই ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স হাঙ্গেরী এদিক থেকে খানিকটা এগিয়ে।

তিনটি স্বর্ণপদক, একটি করে সিলভার ও ব্রোঞ্জ মেডেলসহ মোট ৫টি মেডেল নিতে এখন পর্যন্ত অলিম্পিকের সফলতম দল পেরেঙ্ক পুসকাসদের ম্যাজিকাল হাঙ্গেরী। ছবিঃ ইন্টারনেট

অলিম্পিকে সফলতম দল হাঙ্গেরী। কখনও বিশ্বকাপ জয়ের স্বান নিতে না পারা দলটি ১৯৫২, ১৯৬৪ ও ১৯৬৮ সালে তিনবার অলিম্পিকে স্বর্ণপদক ছাড়াও সিলভার ও ব্রোঞ্জ মিলিয়ে মেডেল জিতেছে ৫টি। ফুটবলের আতুড়ঘর গ্রেট ব্রিটেনও খুব পিছিয়ে নেই, হাঙ্গেরীর সমান তিনবার স্বর্ণপদক জিতেছে তারা।

ফুটবলে পরাশক্তি দেশগুলোর মধ্যে অলিম্পিকে বেশ সফল দল আর্জেন্টিনা। ২০০৮ সালে লিওনেল মেসি ও সার্জিও আগুয়েরোর নৈপুণ্যে শেষবার অলিম্পিক স্বর্ণ জয় করা দেশটি ২০০৪ সালেও পদক জিতে। এই শতকে একমাত্র দল হিসেবে ব্যাক টু ব্যাক অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয় করা দল আকাশী-নীলরা। ছেলেদের অলিম্পিক ফুটবলে দুইয়ে থাকা গ্রেট ব্রিটেনের চেয়েও আর্জেন্টিনার মেডেল একটি বেশি। দুবার অলিম্পিকে স্বর্ণপদক ছাড়াও আরও দুবার সিলভার মেডেলও জয় করেছে দিয়েগো ম্যারাডোনার দেশ।

প্রথম বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়েও অলিম্পিকে দুবার স্বর্ণ জিতেছে। একটি করে স্বর্ণ আছে যুগোস্লাভিয়া, স্পেন, ইতালি, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, নাইজেরিয়া, চেকোস্লোভিয়া, সুইডেন, বেলজিয়াম, কানাডা, ক্যামেরুন, মেক্সিকো, পূর্ব জার্মানি ও ব্রাজিল। অলিম্পিকে একবার স্বর্ণ জয় করা দলগুলির মধ্যে সফলতম দল ব্রাজিল।

২০০৮ সালে মেসি-আগুয়েরো নৈপুণ্যে অলিম্পিকের স্বর্ণপদক ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। ছবিঃ ইন্টারনেট

এমনকি মেডেলের দিক দিয়েও প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সফল দল সেলেসাওরা। ২০১৬ সালে অধরা অলিম্পিক স্বর্ণ জয় করা দলটি প্রতিযোগিতায় তিনটি সিলভার মেডেল ও দুইটি ব্রোঞ্জ মেডেল ছাড়াও চতুর্থ হয়েছে একবার। সবমিলিয়ে অলিম্পিক ফুটবলে ব্রাজিল মেডেল জিতেছে সর্বোচ্চ ৬টি।

সবমিলিয়ে অলিম্পিকে ছেলেদের ফুটবলের গত ৫০ বছরের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় তুলনামূলক ছোট দলগুলোর চেয়েও এখানে ফুটবলের পরাশক্তিরা বেশ পিছিয়ে আছে। পঞ্চাশের দশকে হাঙ্গেরীর টানা রাজত্ব ছাড়াও অলিম্পিকে গেল পঞ্চাশ বছরে তুলনামূলক দুর্বল বেশকিছু ছোট দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দেখা মিলেছে। ১৯৭২ আসরে প্রথমবারের মতো অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণ জিতে পোল্যান্ড।

২০০০ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে সবাইকে চমকে দিয়ে স্প্যানিশদের স্বপ্ন ভেঙে স্বর্ণ জয় করে স্যামুয়েল ইতোর ক্যামেরুন। ছবিঃ ইএসপিএন

তারপর অলিম্পিকে চেকোস্লোভিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন ও মেক্সিকোর মতো দলগুলিও স্বর্ণপদক জিতেছে। এসময় বিশ্বকাপজয়ী দলগুলোর মধ্যে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয় করে কেবল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, পূর্ব জার্মানি, স্পেন ও ব্রাজিল। তাই প্রশ্ন উঠেই যায়, তুলনামূলক দুর্বল দলগুলোর তুলনায় ছেলেদের অলিম্পিকে ফুটবলের পরাশক্তিরা পিছিয়ে থাকে কেন?

লেখা: এ.এইচ বাদশা