ফিচার

জন্মদিন বিশেষ | নেইমার: ব্রাজিলের দুঃসময়ের ধ্রুবতারা

নিউজ ডেস্ক

৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, রাত ৯:১০ সময়

[ screenshot_20220205-025936_messenger ]
ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সান্তোসের হয়ে নজর কেড়েছিলেন নেইমার। ছবিঃ ইন্টারনেট
বাবা ছিলেন গাড়ি মেরামতের কারিগর। হাজার হাজার গাড়ি মেরামত করলেও নিজের ঘরের মেরামত ঠিকভাবে করতে পারেননি। মোগি ডাস ক্রুজেসের বস্তির ঘরটির চালের ছিদ্র বেয়ে নেমে আসত জ্যোৎস্না। তাতে আলোকিত হতো ঘর। অর্থের অভাবেই নাকি এই ফুটো সারাতে পারতেন না বাবা। নাকি ঈশ্বরই চাননি ছিদ্রগুলো সেরে যাক! কেননা, এই ফুটো বেয়েই যে চাঁদের আলোর সঙ্গে ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এক খণ্ড চাঁদও নেমে এসেছিল ভাঙা ঘরে। সে যে নেইমার-চাঁদ! নেইমার ডা সিলভা সান্তোস জুনিয়র। যিনি আলোকিত করছেন ব্রাজিলের ফুটবলকে। হয়েছেন এই সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলারদের একজন। [caption id="attachment_64963" align="aligncenter" width="946"] ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সান্তোসের হয়ে নজর কেড়েছিলেন নেইমার। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] ২০১০ বিশ্বকাপের সময়কার কথা। বয়স কম হালকা পাতলা দেড় গড়নের জন্য ব্রাজিল কোচ কার্লোস দুঙ্গা দলে নিতে চাচ্ছিলেন না ব্রাজিল লীগে আলো ছড়ানো ছোট্ট নেইমারকে। তখন ব্রাজিলিয়ান বিখ্যাত পত্রিকা ‘ও গ্লেবো’তে ছাপা হয়েছিল, “রোনালদোর দুই পায়ের শট, রোমারিওর ভারসাম্য আর বক্সের মধ্যে ক্ষিপ্র চিতার রূপ, রিভালদোর ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং, সতীর্থদের অবস্থান বুঝে নেওয়ার কাকার অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা, রবিনহোর ড্রিবলিং—এই সবকিছুর প্যাকেজ যার মধ্যে, তিনি নেইমার ডা সিলভা সান্তোস জুনিয়র।” ফুটবলই ব্রাজিলিয়ানদের ধর্মকর্ম। ফুটবলেই তাদের সব ধ্যান ধারণা। তাই সহজাতভাবেই জাগো বনিতোর প্রেমিক নেইমার ফুটবল গ্রেট পেলের স্মৃতিবিজড়িত ক্লাব সান্তোসে নাম লিখিয়েছিলেন মাত্র ৭ বছর বয়সে। ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির হয়ে অভিষেকও হয়। ২০০৯ সালে তিনি কম্পেনাতো পুলিস্তার শ্রেষ্ঠ যুবা খেলোয়ার নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে সান্তোসের ২০১০ কম্পেনাতো পুলিস্তা জয় করেন। ২০১০ কোপা দো ব্রাজিলে ১১ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা পুরষ্কার পান। প্রতিনিধিত্ব করেছেন ব্রাজিল অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০ এবং ব্রাজিল মূল দলের। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ২০১১ এবং ২০১২ সালে দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হোন। সান্তোসের হয়ে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে নজর কাড়েন ইউরোপের সব টপ জায়ান্ট ক্লাবদের। তারপর ২০১৩ সালে সান্তোসের সঙ্গে গাঁটছড়া ছিন্ন করে যোগ দিয়েছিলেন স্বপ্নের ক্লাব বার্সেলোনায়। ৫৭ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে নেইমার বার্সেলোনার সঙ্গে ৫ বছরের চুক্তি করেন। কাতালান ক্লাবটিতে লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজকে নিয়ে গড়ে তুলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘এমএসএন’ আক্রমণ ত্রয়ী। [caption id="attachment_64964" align="aligncenter" width="2048"] বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘এমএসএন’ ত্রয়ী। ছবিঃ ইন্টারনেট[/caption] ব্লাউগানাদের হয়ে ৫ বছরে ১৮৬ ম্যাচে গোল করেন ১০৫টি। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৭৬টি। ২০১৫ সালে বার্সেলোনার অবিশ্বাস্য ট্রেবলজয়ে ছিলেন অন্যতম স্বপ্নসারথী। পুরো মৌসুমে অসাধারণ ফুটবল খেলে ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের তালিকায় শীর্ষ তিনেও জায়গা করে নিয়েছিলেন। বার্সেলোনার হয়ে দুটো লা লীগা, ১টি চ্যাম্পিয়নস লীগ, তিনটি কোপা দেল রে, একটি সুপার কোপা কাপ, ১টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপসহ সম্ভব্য সব শিরোপা জিতেছেন। ২০১৭ সালে নানা নাটকীয়তা ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ২২০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনা ছেড়ে পাড়ি জমান ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেই। তবে লা প্যারিসিয়ানদের হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় ইঞ্জুরিকেই যেন সার্বক্ষনিক সঙ্গী বানিয়ে নিয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গিয়ে ইঞ্জুরিতে পড়ে হারিয়েছেন নিজের ক্যারিয়ারের অনেক সোনালী সময় যেগুলো তার ক্যারিয়ারকে আরও উজ্জল করতে পারতো। তবুও থেমে নাই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টারের সংগ্রাম। গেল বছর তার নেতৃত্বে পিএসজি তাদের ক্লাবের ইতিহাসের প্রথমবার ইউরোপ সেরা মঞ্চের ফাইনালে উঠেন। যদিও ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে গিয়ে শিরোপা হাতছাড়া করেন। ফরাসি ক্লাবটির হয়ে ৪ বছরে এখন পর্যন্ত ১৩০ ম্যাচে গোল করেছেন ৯০টি। সতীর্থদের দিয়ে করান আরও ৫৫টি। অর্থাৎ পিএসজি হয়ে ১০১টি ম্যাচে নেইমারের সরাসরি গোলে অবদান ১৪৫টি। ফরাসি ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন ৩টি লিগ টাইটেলসহ মোট ১০টি শিরোপা। [caption id="attachment_64965" align="aligncenter" width="678"] বিশ্বরেকর্ড গড়ে পিএসজিতে যোগ দেন নেইমার। ছবিঃ টুইটার[/caption] জাতীয় দল ব্রাজিলের হয়েও অপ্রতিরোধ্য নেইমার। বলা যায় সেলেসাওদের দুঃসময়ের কান্ডারি তিনি। গেল দশকে ব্রাজিল যখন পারফর্মারের অভাবে ভুগছিল, পুরোটা সময় নেইমার-ই তার অভাব মিটিয়েছে। গেল দশক ব্রাজিলের আক্রমণভাগ একাই সামলিয়েছেন। ২০১০ সালে ব্রাজিল দলে অভিষেক হওয়ার পর ১১৬ ম্যাচে গোল করেছেন ৭০টি। সতীর্থদের দিয়ে করান রেকর্ড চল্লিশের অধিক গোল। সেলেসাওদের ইতিহাসে  হলুদ জার্সিতে কেবল কিংবদন্তি পেলে (৭৭) তাঁর চেয়ে বেশি গোল করতে পেরেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট প্রোভাইডারও নেইমারই। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে চোটের কারণে সেমিফাইনাল মিস করলেও তার আগে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ব্রাজিলকে জিতিয়েছিলেন ফিফা কনফাডেরশন্স কাপ শিরোপা। বনে যান টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলারও। যদিও অনেকের মতে, নেইমারের ব্রাজিল ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন ২০১৬ সালে সেলেসাওদের অধরা অলিম্পিকের সোনা জেতানো। [caption id="attachment_64967" align="aligncenter" width="768"] নেইমারের হাত ধরেই অধরা অলিম্পিকের স্পর্শ পায় ব্রাজিল। ছবিঃ টুইটার[/caption] ২০১৬ – রিও অলিম্পিক, অধরা স্বপ্নপুরণে বুঁদ পুরো ব্রাজিলবাসী। আর সেই স্বপ্নপুরণের কান্ডারি একজনই ছিলেন। নেইমার, নেইমার ডা সিলভা সান্তোস জুনিয়র। পেলে, রোনালদো লিমা, রোনালদিনহো, রিকার্ডো কাকারা যা পারেননি ঘরের মাঠে জার্মানিকে ট্রাইবেকারে হারিয়ে সেই কাজটিই করে দেখিয়েছিলেন নেইমার। ব্রাজিলের ট্রফি ক্যাবিনেটে একমাত্র অলিম্পিকের অপূর্ণতাও পূর্ণ করে দেন। লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল ফুটবলকে দুহাত ভরে দিয়েছে। ছন্দ, শৈল্পিকতার এক অপূর্ব নিদর্শন ব্রাজিল ফুটবলে। পেলে গ্যারিঞ্চা থেকে জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রিভালদো, রোনালদো, রোনালদিনহো ফুটবলের সব রথি মহারথিদের জন্ম হয়েছে এই মাটিতে। তাদেরই হয়তো একজন হতে যাচ্ছে নেইমার। [caption id="attachment_64966" align="aligncenter" width="612"] বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে হারিয়ে ব্রাজিলকে কনফাডেরেশন্স কাপ এনে দেন নেইমার। ছবিঃ টুইটার[/caption] তবে, বিশ্বকাপ ছাড়া নাকি এই দেশের কিংবদন্তি হওয়া যায় না। এত কিংবদন্তির ভিড়ে নিজেকে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে হলুদ জার্সিতে বিশ্বকাপটা বড্ড প্রয়োজন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের। তাই সেলেসাওরা হেক্সা জয়ের স্বপ্নও বুনছে নেইমারকে ঘিরে। নেইমার কি পারবে রিও ডি জেনেরার মহাকাব্যিক অলিম্পিক জয়ের মত আরও একবার জাগো বোনিতার ঝান্ডা উড়াতে? চলতি বছর হয়তো কাতারেই এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে। আপতত ব্রাজিলিয়ান ফুটবল যুবরাজকে ৩০তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা।

শুভ জন্মদিন, নেইমার জুনিয়র।

লেখা: এ.এইচ বাদশা