ক্রিকেট > বাংলাদেশের ক্রিকেট

বিসিবি-সাকিবের অপেশাদারিত্বের শেষ কোথায়?

কখনো বিসিবিকে আবার কখনো ক্রিকেটারদের মনে হচ্ছে অন্য আরেক পক্ষের কাছে অসহায়। কখনো বা দুই পক্ষই মেতে উঠছে ইগোর অস্বাভাবিক খেলায়।

নিউজ ডেস্ক

৯ মার্চ ২০২২, রাত ১২:৫০ সময়

[ ছবি- ডেইলি স্টার ]
ছবি- ডেইলি স্টার

অপেশাদার স্থানে যেমন পেশাদারিত্ব দেখালে সেটির কোন মূল্য থাকে না আবার ঠিক তেমনি পেশাদারিত্বের স্থানে অপেশাদারিত্ব একেবারে ঘুনে খাওয়া কাঠের মত পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন বলতে গেলে এখন তেমনই এক রীতি চলে এসেছে। আর এই রীতি চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। দেশের ক্রিকেটে এমন কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনা ফলাও করে প্রকাশ করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও। 

বিসিবি, সাকিব কিংবা বিসিবি এবং বাকি সব ক্রিকেটারকে দুটি ভিন্ন পক্ষ মনে হচ্ছে সবসময়ই। কখনো বিসিবিকে আবার কখনো ক্রিকেটারদের মনে হচ্ছে অন্য আরেক পক্ষের কাছে অসহায়। কখনো বা দুই পক্ষই মেতে উঠছেন ইগোর অস্বাভাবিক খেলায়। শুরুতে সাকিব আল হাসান ইস্যুতে শেষ দুইদিনে যেসব মন্তব্য এসেছে বোর্ড ও ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে সেগুলোর সারাংশতে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

সাকিব বলেছেন, 

দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ নিয়ে যেটা বলতে হয়…মানসিক ও শারীরিক যে অবস্থায় আছি আমার কাছে মনে হয় না আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা সম্ভব খুব একটা। এই কারণে আমার মনে হয়, যদি আমি একটা বিরতি পাই, আমি যদি ওই আগ্রহটা ফিরে পাই তাহলে আমার খেলাটা সহজ হবে। 

সাকিবের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের পাল্টা প্রশ্ন -  

আইপিএলে নাম দেবার সময় সাকিবের এই অবস্থা ছিল কিনা? 

আফগানিস্তান সিরিজ সম্পর্কে সাকিব জানান,

কারণ আফগানিস্তান সিরিজে আমার কাছে মনে হয়েছে আমি একজন যাত্রী, যেটা আমি হয়ে কখনোই হয়ে থাকতে চাই না। আমি খেলাটা একদমই উপভোগ করতে পারিনি। পুরো সিরিজটাই, টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে। আমি চেষ্টা করেছি কিন্তু হয়নি। আমার মনে হয় না এরকম মন মানসিকতা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় সিরিজ খেলাটা ঠিক হবে।

বিসিবি সভাপতিও এতে সরাসরি রিঅ্যাকশন দেখিয়েছেন গণমাধ্যমের সামনে। 

ছবি - সংগৃহীত

নাজমুল হাসান পাপন বলেন, 

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে তো আইপিএলেও খেলতে নাম দিতো না।

লজিক্যালি চিন্তা করে তো আমার তা-ই মনে হয়। ও যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে, তাহলে তো আইপিএলের জন্য খেলতে যাওয়ার কথা না। কিন্তু সে তো আবেদন করেছে। তাহলে কি আইপিএলে সুযোগ পেলেও এরকম বলতো…বলতো 'খেলবো না?’ আমরা মোটেও বিচলিত নই। ও মানসিক, শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত। ওর যদি সমস্যা হয় আমাদের জানাতে পারে। বিমানবন্দরে বলে দেওয়া... ও তো দিনের বেলায় আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতো। কোচের সঙ্গে কথা বলতে পারতো। সুজনের (খালেদ মাহমুদ) সঙ্গে কথা বলতে পারতো। হঠাৎ করে এভাবে চমক দেওয়া! কেন করছে অনেকে এটা পছন্দ করেনি।"

বিসিবি বস বলেন, "এই টেস্ট খেলবো, ওই টেস্ট খেলবো না, তা তো হতে পারে না। ওর যদি খেলতেই ভালো না লাগে, তাহলে তো কিছু বলার নেই। যাদের আমরা এত ভালোবাসি, তাদের প্রতি এখনও নমনীয় আছি...। কিন্তু ওদের পেশাদার হতে হবে। তা না হলে একটা সময় আসবে, যখন আমাদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তখন কারও তা পছন্দ হবে না।"

সংবাদমাধ্যমকে পাপন বলেছেন,

সাকিব যদি কোনও সিরিজে না যায়, কেউ কিছু বলবে না। আপনারা কেউ কিছু বলবেন না। কিন্তু সাকিবকে যদি কোনও সিরিজ থেকে বাদ দিই, তখন কী হবে? তখন আপনারা বোর্ডের বিপক্ষে যে হুলুস্থুলটা বাঁধাবেন, চিন্তা করে দেখেন। কে কোন সংস্করণে খেলবে, এটা কিন্তু খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা নয়। বোর্ডেরও নয়। এটা কোচিং স্টাফ সিদ্ধান্ত নেয়।

ক্রিকেটারদের সাথে বোর্ড বা ম্যানেজমেন্টের যোগাযোগ এর সমস্যা আছে কিনা তেমন প্রশ্নে সোজাসাপ্টা উত্তর পাপনের।  পাপন বললেন, “যোগাযোগের সমস্যা কোথায়? যোগাযোগের সমস্যা হয় বলেই তো লিখিত নিয়েছি। তারপর যদি বলে, ‘খেলবো না’, তাহলে এটা যোগাযোগের সমস্যা হয় কীভাবে? আপনারা যোগাযোগের ফারাক বলতে বোঝাচ্ছেন, আমাদের সঙ্গে কোনও সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের তো সমস্যা হচ্ছে না।” অথচ সাকিব জানিয়েছেন তিনি এমন কোন লিখিত ফরম পাননি। 

এরপর মন্তব্য করেছেন জাতীয় দলের টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজনও। মিরপুরে সুজন বলেছেন, "এখন ফুল স্টপের সময় চলে এসেছে। দ্যাটস এনাফ। আপনি বিসিবিকে ডিকটেক্ট করতে পারেন না। আপনি বলতে পারেন না যে আমি খেলবো…খেলবো না। আপনি যদি খেলতেই চান, তাহলে ঠিকমতো খেলুন। যদি খেলতে না চান তাহলে বলে দিন। যদি ব্রেক চান তাহলে পুরোপুরি ব্রেক নিন। কেউ আপনাকে আটকাবে না। প্রেসিডেন্টও বলতে চান এভাবে। হয়তো বা উনি একটু আস্তে বলেছেন, আমি একটু উচ্চস্বরে।"

"নিশ্চিতভাবেই শেষ কল বিসিবির। বিসিবির প্রোডাক্ট ওরা, বিসিবি ওদের প্রোডাক্ট না। বিসিবি কোনও ব্যক্তির জন্য না, বিসিবির জন্যই ওরা। নিশ্চিতভাবেই ওরা বাংলাদেশ ক্রিকেটের মেইন স্টেকহোল্ডার। কিন্তু এই স্টেকহোল্ডারদের জন্য তো বিসিবির অনেক ইনভেস্টমেন্ট ছিল। অনূর্ধ্ব-১৪, ১৫, ১৭…তাদের বিল্ডআপ করা; এই করা সেই করা। তাদের পেছনে তো বিসিবি অনেক খরচ করেছে সেই সময়। বিসিবি তো তাদের অভিভাবক, আমাদের সবার অভিভাবক। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ওপর আমরা কেউ না, তারাও না।"

এইভাবে মন্তব্য আসছে দুপক্ষ থেকেই। যে কথাগুলো দুই পক্ষই গণমাধ্যমের সামনে এসে বলছেন সেগুলো কি তারা বিসিবিতে বসে নিজেদের মধ্যে সমাধান করতে পারতেন না? পেশাদারিত্ব দেখাতে পারেননি সাকিব কিংবা বোর্ডের কেউই। সাকিব নিজের সমস্যাগুলি বলবেন মিডিয়ার সামনে না, বিসিবির কাছে। একইভাবে সাকিবের কথার উত্তরগুলো কাঁদার মত মিডিয়ার সামনে আসাটা উচিত না বিসিবির পক্ষ থেকেও। এমনটা মনে করেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদও। 

তিনি বলেন, “বিশ্বের বড় বড় দলগুলোর অনেক ক্রিকেটার অবসর নেয়। তাদের ছাড়া দল চলছে না। ভারতের ধোনিকে ছাড়া ভারত চলছে না। সাকিবকে বাদ দিলেও বাংলাদেশ চলবে। হয়তো শুরুতে কিছুটা সমস্যা হবে, কিন্তু একপর্যায়ে ঠিক হয়ে যাবে।" বিসিবির পেশাদ্বারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আমি মনে করি বিসিবির আরও পেশাদার হওয়া উচিত। সাকিবের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য কেন? বিসিবির উচিত এগুলো বসে সমাধান করা। সবকিছু মিডিয়াতে কেন বলতে হবে? আমার কথা হচ্ছে, অভিভাবক হিসেবে দায়টা বিসিবির কাঁধেই যায়।"

বিসিবি এবং ক্রিকেটারদের এমন অপেশাদার আচরণ কিংবা দুইটি ভিন্ন পক্ষ হয়ে রীতিমত দেশের ক্রিকেটের জন্য ভয়ংকর আত্মাহুতির মত ব্যাপার। দ্রুত সমাধান বের না করলে দেশের ক্রিকেটে নেমে আসবে অমাবস্যার ঘন অন্ধকার। একবার ক্রিকেট খাদে পড়লে, সেই বাংলাদেশের ক্রিকেট আর সহজে হাসবে না। ভয়টা এবার সত্যিই পাওয়া উচিত।