ফিচার

অজন্তা মেন্ডিস: ধূমকেতুর হয়ে এসে যিনি ধূমকেতুর মতোই হারিয়ে গেলেন

এলেন, দেখলেন, জয় করলেন এবং দ্রুতই হারিয়ে যাওয়া একটি নক্ষত্রের নাম অজন্তা মেন্ডিস।

ডেস্ক রিপোর্ট

১৩ মার্চ ২০২২, দুপুর ২:৪৬ সময়

[ Screenshot_20220313-140524_Gallery.jpg ]
ইন্টারনেট

সম্ভবত ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি আফসোসের নাম। অনেকটা আসলেন দেখলেন এবং অল্প কিছু সময় রাজ করে চলে গেলেন। যার মায়াবী সব জাদুকরি ঘূর্ণিতে একদা কুপোকাত হয়েছিল বিশ্বে বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যান; ধুমকেতুর হয়ে এসে তিনি ধূমকেতুর মতোই হারিয়ে গেলেন। এখনও ক্রিকেটের কোন প্রতিভার প্রচন্ড অপচয় হলে প্রথমে তার কথাই চলে আসে। এক অমীয় সম্ভাবনাময় প্রতিভা অকালেই ঝড়ে পড়ার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে গেলেন শ্রীলঙ্কার সাড়া জাগানো বোলার বালাপুয়াদুগে অজন্তা উইন্সলো মেন্ডিস।

খুবই আনপ্রেডিক্টেবল বোলিং ধরন ছিল মেন্ডিসের। ক্রিকেটের রহস্যময় ক্যারম বোলিংয়ের জনক তিনি। বল সোজা অফ স্পিন করবে, নাকি হালকা বাঁক কেটে দুসরা হয়ে ভিতরে ঢুকবে তা কবজির মুভমেন্ট দেখে বোঝার উপায় ছিল না। একই সাথে গুগলি, অফব্রেক, ফ্লিপার, লেগ-ব্রেকস, টপ স্পিন সব ধরনের বোলিংয়ই করতে পারতেন।

মেন্ডিস ইতিহাসের একমাত্র বোলার যিনি ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই এক ইনিংসে ৬টি উইকেট নিয়েছেন। ক্রিকেটে একদিনের আন্তর্জাতিক ফরম্যাটে দ্রুততম পঞ্চাশ উইকেটের রেকর্ডটি ছিল ভারতের অজিত আগারকার; মাত্র তেইশ ম্যাচে পঞ্চাশ উইকেট শিকার করেন তিনি। মেন্ডিস এই রেকর্ডটি ভেঙে দিয়েছেন ১৯ ম্যাচেই।

শ্রীলঙ্কার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অজন্তা মেন্ডিসের অভিষেক হয় ২০০৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। রহস্যময় বোলিং ধরনে অভিষেক ম্যাচেই চমকে দেন উইন্ডিজের সব ব্যাটসম্যানদের। ১০ ওভারের কোটা পূরণ করে ৩৯ রান খরচে উইকেট শিকার করে ফেলেন তিনটি। এই ম্যাচেই তার পারফরম্যান্স দেখে রব স্টিন বলে ফেললেন,

I have just seen the future of spin bowlingand his name is Ajantha Mendis.

ক্রিকেটের ওয়ানডে ফরম্যাটে মেন্ডিসের আসল রুপ দেখা যায় ২০০৮ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে একাই শ্রীলঙ্কার জয় নিশ্চিত করেন। ফাইনালে শ্রীলঙ্কার প্রতিপক্ষ ছিল প্রতাপশালী ভারত।

এমনিতেই ক্রিকেটের অন্যতম পপুলার কথাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, উপমহাদেশে স্পিন বোলিং খেলা ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের জন্য দুধভাত! এখানে স্পিন বলটা নাকি টিম ইন্ডিয়া ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও খেলতে পারে। এশিয়া কাপের সেই ফাইনালে মাত্র ১৩ রানে ৬ উইকেট নিয়ে মেন্ডিস একাই গুড়িয়ে দেন ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপ। মেন্ডিস ঘূর্নিতে ভারতকে ১০০ রানে উড়িয়ে দিয়ে শ্রীলঙ্কা চতুর্থ এশিয়াকাপ জিতে নেয়। ১৩ রানে মেন্ডিসের ৬ উইকেট এখনও এশিয়া কাপের ফাইনালে বেস্ট বোলিং ফিগার।

অজন্তা মেন্ডিস ফাইনালের ম্যাচসেরা হয়েছেন বটেই; সর্বোচ্চ ১৭ উইকেট নিয়ে আসরের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হন। ফুরিয়ে না যাওয়ার আগ পর্যন্ত মেন্ডিস লঙ্কানদের জার্সি গায়ে ওডিআই ফরমেটে ৮৭ ম্যাচে ৮৪ ইনিংসে ১৫২ উইকেট শিকার করেন। ছোট্ট ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ফিফার পান তিনবার, চার উইকেট শিকার করেন সাতবার।

২৩শে জুলাই ২০০৮ সালে কলম্বোর শিংহালস স্পোর্টস ক্লাব গ্রাউন্ডে টেস্টে মেন্ডিসের অফিশিয়াল অভিষেক হয় ভারতের বিপক্ষে। সুন্দর এক দারুণ ক্যারম বলে প্রথম উইকেট শিকার করেন দ্যা ওয়াল খ্যাত রাহুল দ্রাবিড়। তারপর ভিভিএস লক্ষ্মণ, অনিল কুম্বলে এবং জহির খানকেও আউট করেন। সেই সময়কার মেন্ডিস কতটা ভয়ংকর ছিলেন সেই সিরিজের পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়।

ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে দুই ইনিংসে শিকার করে ৮ উইকেট। তার ১৩২ রানে ৮ উইকেট বোলিং ফিগার এখনও লঙ্কান অভিষ্কক্ত বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ। তারপরের ম্যাচে শিকার করেন আরও ১০ উইকেট। তৃতীয় ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে এই সিরিজে মাত্র ১৮ গড়ে একাই শিকার করেন মোট ২৬ উইকেট। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে মেন্ডিসের চেয়ে বেশি উইকেট শিকার করতে পারেনি আরও কোন বোলার। তার বোলিং জাদুতে মুগ্ধ কিংবদন্তি মুত্তিয়া মুরালিধরনও বলেন, 

When I started playing Test cricket, I was not as good as Mendis. He is exceptional. He is the future of Sri Lankan cricket.


শ্রীলঙ্কা-ভারত টেস্ট কাভারে ছিল টেন স্পোর্টস। এই চ্যানেলে তখন মেন্ডিসে মায়াবী জাদুর বোলিংয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতো। টানা অনেকদিন মেন্ডিসের ঘূর্ণি জাদুর স্পিন দেখাতো। কথিত আছে যে, সিরিজে নাকি ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা লিফটের মধ্যেও অজান্তা মেন্ডিসের বোলিং কল্পনা করতো। এই বছর জিতেন আইসিসির বর্ষসেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার। শুরুটা কত দুর্দান্তই না শুরু করেছিলেন। টেস্টে ১৯ ম্যাচে ৩১ ইনিংস বোলিং করে আউট করেন ৭০ জন ব্যাটসম্যান। টেস্টে ফিফার পান মোট চারবার, চার উইকেট পান ৫ বার এবং ১০ উইকেট পান ১ বার।

টি-টুয়ান্টি ক্রিকেটে মেন্ডিসে অভিষেক হয় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ফোরনেশন্স সিরিজে। অজন্তা মেন্ডিসের ডেব্যু ম্যাজিক চলে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও। প্রথম ম্যাচেই ১৫ রানে ৪ উইকেট শিকার করে ম্যাচ সেরা পুরস্কার জিতে নেন। পরের ম্যাচ কানাডার বিপক্ষে ১৭ রানে শিকার করে আরও ৪ উইকেট। ফাইনালে দারুণ ফর্মে থাকা পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৩ রানে ৩ উইকেট শিকার করে শ্রীলঙ্কাকে জিতান ফোর নেশন্স টুর্নামেন্ট। পুরো আসরে তিন ম্যাচে ৫৫ রানে ১১ উইকেট শিকার করে টুর্নামেন্টের সেরা প্লেয়ারের পুরস্কার নিজের করে নেন।

২০০৯ ইংল্যান্ড, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী ছিলেন মেন্ডিস। টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে সেরা প্লেয়ারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় নিজের নাম করে নেন। ক্রিকইনফোর বিশ্বকাপের সেরা একাদশেও নাম ছিল মেন্ডিসের।

মেন্ডিস টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে এক ইনিংসে ৬ উইকেট শিকার করেন। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৬ রানে একাই ছয় অজি ব্যাটসম্যানকে আউট করেন।

পরের বছর ২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্ব কাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এক ইনিংসে আবারও ৬ উইকেট শিকার করেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অজন্তা মেন্ডিস ব্যাতীত আর কোন বোলারই এক ইনিংসে একের অধিক ছয় উইকেট শিকার করতে পারেনি। ২০১২ সালে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেরা একাদশেও ছিল তার নাম। শ্রীলঙ্কার হয়ে ৩৯টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১৪.৪২ গড়ে উইকেট শিকার করেন মোট ৬৬ টি।

শুধুমাত্র পরিসংখ্যান দিয়ে কখনোই বুঝানো যাবে না, কি ভয়ংকর সুন্দর শুরু করেছিলেন অজন্তা মেন্ডিস। তবে, ক্যারিয়ারের শুরু যতটা ঝলক ছিল, শেষটা তার চেয়েও বাজে যায় রহস্যময় এই বোলারের। একসময় তো শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় বিভাগেও খেলতে হয় মেন্ডিসকে। মূলত, মেন্ডিসের বল বোঝার পরেই ব্যাটসম্যানরা তাক বেধড়ক পিটিয়ে ছাল তুলে ফেলতেন! প্রায় ৫ বছর জাতীয় দলে বাহিরে থাকার পর ২০১৮ সালে জুলাই মাসে অভিমানেই সবধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে আড়ালে চলে যান। কিংবদন্তি মুরালিধরনের চেয়েও উজ্জল তাঁর আগমন আর নীরবেই ধ্বংস হয়েছে তাঁর ক্যারিয়ার।


প্রতিভার সঠিক বিকাশের জন্য শৃঙ্খলা এবং কঠোর পরিশ্রম কতটা জরুরি তার যথার্থ উদাহরণ অজন্তা মেন্ডিস। তাঁর ক্যারিয়ার থেকে আমরা একটা জিনিস শিক্ষা নিতে পারি, শুধু প্রতিভা বা স্কিল যাই থাকুক; আসল জিনিস হলো কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। যে দুটোর অভাবে অমীয় সম্ভবনাময়ী এক প্রতিভার আসলে ছটা দেখা হল না ক্রিকেটবিশ্বে। ক্রিকেটের আজন্ম আক্ষেপ হয়ে থাকবে দ্য গডফাদার অব ক্যারম বোলিং অজন্তা মেন্ডিস

লেখা: এ.এইচ বাদশা