ফিচার

জন্মদিন বিশেষ | সাকিব আল হাসান, রেকর্ড ব্রেকার, ডিফারেন্স মেকার

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ও বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোষ্টারবয় সাকিব আল হাসানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমাদের আজকের আয়োজন।

ডেস্ক রিপোর্ট

২৪ মার্চ ২০২২, রাত ৯:৫৩ সময়

[ 291765.4.jpg ]
ইন্টারনেট

১৯৮৭ সাল, মার্চের ২৪ তারিখ। বাবা মোটামুটি পরিচিত ফুটবলার! দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের পর প্রথম ঘরে জন্ম নিলো ফুটফুটে এক বাচ্চা। বাবার সে কি ইচ্ছা ছেলে ফুটবলার হবে। ছেলেরও মোটামুটি ফুটবলের প্রতি ঝোক ছিল। ছেলের কৈশোর কাল।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ জিতল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের খেলার সুযোগ। সে কি অনুভূতি,সে কি পাওয়া। অপরিচিত দেশে পরিচিত ফুটবলের ভীড়ে অপরিচিত ক্রিকেট নামক খেলা নিয়েও এত আবেগ, এত তাড়না? ফয়সালের তখন থেকেই হয়তো ক্রিকেটের প্রতি একটু আদটু ইচ্ছা জন্মেছিল।

একবার একজন বাজি ধরে বসলো এলাচ বিস্কিট দিয়ে! "ফয়সাল বাজিতে খেলবি? এলাচ বিস্কিটের বাজি!" এই বিস্কিট ফয়সালের এত পছন্দ, সামান্য এক বিস্কিটেরই বাজিতে খেলতে রাজি হয়ে গেল নিদ্বিধায়! খেললো" এলাচ বিস্কুট জিতেও গেল। মাগুরার ফয়সালের কাছে তখন এলাচ বিস্কিট বড় ছিল, নাকি ক্রিকেট সেটা হয়তো সেই জানতো। তবে নিশ্চিতভাবে অন্য কেউ জানতো না, ওই বাজি ধরা বন্ধুটাও হয়তো জানতো না ফয়সাল আগামীর সাকিব, যে এক বিপিএল ম্যাচসেরা হয়েই জিতে যাবে ৫০০ ইউএস ডলার যা দিয়ে মোটামুটি বছরখানেকের জন্য এলাচ বিস্কিট কিনে রেখে দেয়া যাবে আরামসে!

বিকেএসপি থেকে উঠে আসা ফুটবলার বাবার তুখোড় মেধাবি বালকের স্বপ্নের অভিষেক ২০০৬ এ। বাংলাদেশ ক্রিকেট! জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

কিছু কিছু মানুষ স্রোতের অপরদিকেই চলে,চলতে পছন্দ করে।ওদপর ভাগ্যও সহায় হয়ে যায়,সহজেই নিজের ইচ্ছানুযায়ী জিনিস হাতের কাছে পেয়ে যায়,বানিয়ে নেয় সম্ভবত। নয়তো ক্যালিসদের যুগে কোথাকার কোন সাকিব এসে আস্তে করে মধ্যে দিয়ে হয়ে যাবে বিশ্বসেরা, তাও তাদেরই টপকে?

রেকর্ডের পাতাও একটু চোখ বুলানো যাক!

সাকিব যেসময় প্রথম টেস্ট শতক হাঁকাল , তখন ৪-৫৬ রানের মধ্যখানের সব রান বাউন্ডারিতে, যেটা টেস্ট ক্রিকেটে আর কারো নেই। প্রথম অলরাউন্ডার হিসেবে ১২০০০+ রান ও ৬০০+ উইকেট। টেস্ট ইহিহাসে ফাস্টেস্ট ৩০০০ রান ও ২০০ উইকেট পাওয়া একমাত্র অলরাউন্ডার সাকিব। ইনিংসে ১০ উইকেট ও ১০০ রান করা প্লেয়ার পুরো ইতিহাসে ৩ জন, এইখানেও সাকিব সিট দখল করে বসা। ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম ৫০০০ রান ২০০ উইকেট ও ৬০০০ রান ২৫০ উইকেট নেওয়া প্লেয়ারের নাম সাকিব। সাকিবের অভিষেকের পর সাকিবের চেয়ে বেশি ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন মাত্র দুজন। ভিরাট কোহলি আর এবি ডি ভিলিয়ার্স। সাকিবের অভিষেকের পর সাকিব সিরিজ সেরা হয়েছেন ৭ বার। মাত্র একজন খেলোয়াড় তার থেকে বেশিবার সিরিজ সেরার পুরুস্কার স্যুটকেসে ঢুকিয়েছেন। তিনিও ভিরাট কোহলি!

এবার আসা যাক ওয়ানডে বিশ্বকাপে। ২৯ ম্যাচে ৪৫ গড়ে বিশ্বকাপে সাকিবের রান ১১৪৬! বোলিং এ ৩৪ উইকেট। মাত্র তিনজন স্পিনার তার থেকে বেশি উইকেট পেয়েছেন বিশ্বকাপে। একটা জায়গায় সাকিব তার নিজের রাজ্য খুলে বসা!

ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১০০০ রান ও ৩০+ উইকেট বিশ্বকাপে। আর একটা চোখ কপালে তুলা তথ্য শুনবেন? সাকিবই ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে একমাত্র প্লেয়ার যার ওয়ানডে গড় কখনো ৩০ এর নিচে নামেনি। চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো পরিসংখ্যান!

একই সাথে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে নাম্বার ওয়ান হওয়া প্রথম অলরাউন্ডার এবং এখন অব্দি এটাই প্রথম এবং শেষ। সাকিবের আন্তর্জাতিক  ক্রিকেটে প্রথম হাতেখড়ির সময় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা তিনজন অলরাউন্ডারের সময়ে।

সাকিব তার অভিষেকের ৪ বছরের মাথায় চলে আসলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের খাতার সবচেয়ে উপরের নাম হয়ে। ২০১৩ সালে সাকিব হয়ে গেলেন ইতিহাসের একমাত্র প্লেয়ার হিসেবে একই সময়ে তিন ফরম্যাটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার! এই ইতিহাস আর কারও নেই, এই ইতিহাস সাকিব পরে আর কেউ ছু্ঁয়ে দেখতে পারেনি, এই বইয়ের পৃষ্টা একটাই এবং বড় করে নামটাও একজনের, সাকিব আল হাসান রেকর্ড ব্রেকার, ডিফারেন্স মেকার।

এবার সাকিবের কয়েকটা সেরা ইনিংসে চোখ দেওয়া যাক। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের সাথে ৫৫ বলের ৭৯ রান করে প্রায় দেড় বছর পর ফিরলেন রানে, হয়তো ওই পুল না খেলতে গেলে বাংলাদেশ একসাথে টানা ৪ বিগ ফিসদের সাথে সিরিজ খেলে সবকটা জিততো। এরপর থেকে মূলত সাকিব ফিরলেন তার ক্যারিয়ার সেরা ফর্মে।

দুই এক ম্যাচ খারাপ গেলেও সাকিব তখন থেকে হয়ে উঠলেন পুরেদস্তর এক ধারাবাহিক পারফর্মার। ২০১৬ সালে ইংলিশদের সাথে ৫ উইকেট নিয়ে করলেন আজিব এক ট্রেডমার্ক স্যালুট উদ্‌যাপন। যে সাকিব উইকেট পেলে সাধারণ সেলিব্রেশনও করেন না অনেক সময়, সে এমন এক সেলিব্রেশন করলেন যেটা হয়ে গেল আরেক ইতিহাস। ২০১৭ সালে মনে রাখার মত এক ইতিহাস গড়ল যেটা বাংলাদেশ ইতিহাসে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত এটাই শেষ, এটার পর হয়ত অনেক রেকর্ড হবে কিন্তু প্রথম হিসেবে এটাই টেস্ট ক্রিকেটে লিপিবদ্ধ থাকবে বাংলার ডায়েরিতে। অজিদের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট জয় এবং সেটাও সাকিবের হাত ধরে। এই টেস্টে সাকিব করলেন নিজের জন্য আরও এক রেকর্ড। সকল টেস্ট খেলুড়ে দেশের সাথে ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তি যদিও এখন টেস্ট খেলুড়ে দেশ ১২টা।

২০১৯ বিশ্বকাপে ফটোসেশনে না আসায় সে কি কান্ড! সবাই সাকিবের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে সাকিব যা করলো, বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসে এমন খেলা মাত্র তিনজন বিশ্বকাপে করে দেখিয়েছে। তার মধ্যে সাকিব সেমিফাইনালেও খেলতে পারেনি, বাকিরা ফাইনাল খেলেও কিছু ক্ষেত্রে সাকিবের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এক বিশ্বকাপের কীর্তিতে নিন্দুকের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন সাকিব। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের সেরা রান গেটার, সেরা উইকেট টেকার সেই। এই কীর্তি নেই ৫০ বছরের ওয়ানডে, ২০ বছরের টি-টুয়েন্টি ইতিহাসের কোনও খেলোয়াড়ের।

এক দিকে রেকর্ড সরিয়ে রাখলেও বিশ্ব ক্রিকেটে আসা অল্প কজন অসাধারণ প্রতিভার মধ্যে সাকিব আল হাসানও একজন। সাকিব ট্যালেন্টের জোড়েই পারফর্ম করেছেন অনেকদিন। কাউন্টি প্রথম খেলতে গিয়ে সাকিব আচ করলেন নিজেকে ভেঙে তৈরী করলে আরো উন্নতি সম্ভব। এরপর সাকিব অন্যরূপে ফিরলেন, সাকিব সেটা নিজেই বলেছেন। আবার ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে সাকিব আধুনিক ক্রিকেটের সিস্টেম বুঝে আবারো ভাঙলেন নিজেকে। ১.৫ মাসে কমালেন ৬ কেজি ওজন, বুঝলেন ফিটনেস ছাড়া এখনকার যুগে টেকা দায়,ফল বাংলাদেশ পেল, সাকিবও পেলেন।

নিন্দুকেরা সুযোগ পেলেই সাকিবকে খোঁচা মেরে বলে, সাকিব নাকি ব্যাটিং পারে না। অথচ ওয়ানডে ইতিহাসে সাকিব আল হাসানই একমাত্র খেলোয়াড় যার ব্যাটিং গড় কখনো ৩০ এর নিচে নামেনি। সাকিব টি টোয়েন্টি খেলোয়াড় না, অথচ সাকিব টি টোয়েন্টি ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারের তালিকায়েও সাকিব সেরাদের কাতারেই আছে। যার দেড় হাজারের বেশি রান ও একশোর বেশি উইকেয় আছে। টি টোয়েন্টি ইতিহাসের সেরা উইকেট শিকারীও সাকিব। এমনকি টি-টোয়েন্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ সিরিজ সেরাও সাকিব তিনিই।

বাংলাদেশের অসংখ্য জয়ের অবদান সাকিবের। তাই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকাও তিনিও। লাল-সবুজের দেশে সাকিব আল হাসান একটি ব্র‍্যান্ডের নাম। সাকিব দেশের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার।

আজ সাকিব আল হাসানেত ৩৫তম জন্মবার্ষিকী। এক সময় বাসের ছাদে চড়ে অনুশীলনে যোগ দেওয়া সাকিব এখন ২৭০ কোটি টাকার মালিক। এক সময় ক্রিকেটের অনেক টার্মই বুঝতে না পারা সাকিব আজ ১৫ বছর ধরে অলরাউন্ডারের কোটাকে অনেকটাই নিজের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন। অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

সাকিব বাবার সাথে এলাচ বিস্কুটের জন্য বাজি ধরে ছিল; আর আজ সাকিব কত রেস্তোরাঁর মালিকও। বস্তুত এত পাওয়ার মধ্যেও সাকিব আল হাসানেরও হতাশা আছে, ভীষণ চাপা কষ্ট আছে।

এবং সবচেয়ে বড় হতাশা বাংলাদেশের হয়ে কোন বড় শিরোপা না জেতা। ২০১৯ বিশ্বকাপে যুগান্তকারী পারফরম্যান্স করে ও দেশকে বড় কোন কিছু এনে না দিতে পারার দুঃখ এখনও বহন করছেন তিনি।

তারপরও এই দেশের ক্রিকেট পাগল জাতি সাকিব আল হাসানের কাছে বড় কৃতজ্ঞ। হয়তো সেই জন্যেই ষোল কোটি মানুষের জান তিনি। একসময় এদেশের মানুষ যাকে চাঁদ ভাবতো, এখন তিনি বিস্তীর্ন আকাশ।

লেখা: মোফাজ্জল হোসেন নাবিল