ফিচার

রোনালদো নাজারিও: টেল অব দ্য গ্রেটেস্ট নাম্বার নাইন

’আসল রোনালদো’ ছিলেন এমন এক ভয়ংকর স্ট্রাইকার যার নাম শুনলেই বিশ্বের কোটি কোটিন নব্বই দশক জন্ম নেওয়া প্রতিটি ফুটবল অনুরাগীদের রক্তে নাচন ধরে। তাই, সর্বকালের সেরা নাম্বার নাইনের তালিকায় তিনিই সেরা।

ডেস্ক রিপোর্ট

২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, রাত ১১:৩৭ সময়

[ Screenshot_20220921-232352_Gallery.jpg ]

কুইজ কুইজ কুইজ। ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে বড় দ্বৈরথ নিঃসন্দেহে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার লড়াই। আচ্ছা বলুন তো, পৃথিবীর কয়জন ফুটবলার রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা উভয় দলের হয়েই ‘এল ক্লাসিকো’ মাতিয়েছেন আর উভয় দলের হয়েই গোল উৎসব করেছেন? 

চলুন প্রশ্নটা আরেকটু সহজ করেই বলি, পৃথিবীর কয়জন ফুটবলার এল ক্লাসিকো মাতিয়েছেন এবং একই সঙ্গে ইতালির সবচাইতে বড় দ্বৈরথ মিলান ডার্বিতেও এসি মিলান ও ইন্টার মিলান দুই দলের হয়েই গোল করেছেন? 

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আপনি অনেক জনের নাম বলতে পারবেন। কিন্তু, পরের প্রশ্নের উত্তর খানিকটা জঠিল হলেও জবাব একজনই। রোনালদো লুইস নাজারিও দ্যা লিমা! পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বকালের সেরা নাম্বার নাইন। অনেকের মতে, তিনি ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকারও বটে।

প্রায় টানা সতের বছর প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে একের পর এক গোল করে নিজেকে নিয়ে গেছেন ফুটবলের অনন্য উচ্চতায়। ২টি বিশ্বকাপ, ২টি কোপা আমেরিকা, দুবার ব্যালন ডি'অর, তিনবার ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরষ্কার পাওয়া রোনালদো নিজের ক্যারিয়ারে একমাত্র চ্যাম্পিয়নস লীগ ছাড়া সম্ভব্য সবই জিতেছেন।

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। মেসিকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাঁর চোখে সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার কে? কোনো চিন্তা না করেই আর্জেন্টাইন মহাতারকা বলে দিলেন “রোনালদো নাজারিও”। সঙ্গে আরো বললেন, “আমি তাঁর বিপক্ষে খেলতে পেরে ভাগ্যবান, আরো ভাগ্যবান এই জন্য যে আমি যখন খেলেছি তখন তিনি চোটের কারণে তাঁর সেরা ফর্মে নেই। শুধু সেরা নাম্বার নাইন না, সর্বকালের সেরা তালিকায়ও উনি সামনের দিকেই থাকবেন।” 

প্রারম্ভিক জীবন:

১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেরিওর হত দরিদ্র দম্পতি বাবা নেলিও নাজারিও দি লিমা ও মা সোনিয়া দোস সান্তোস বারাতার ঘর আলো করে আসেন ফুটফুটে রোনালদো।

রোনালদোর পরিবার এত দরিদ্র ছিল জন্মের পর সন্তানের নাম রেজিষ্ট্রেশন করতে বাবা মায়ের দুইদিন অপেক্ষা করতে হয়। রোনালদোর বয়স যখন মাত্র এগারো বছর, পরিবারের দারিদ্রতা যখন চরম শিখরে, জীবনের সবচাইতে বড় অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি ঘটে - তার বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়! টাকা পয়সার অভাবে খুব বেশি পড়াশোনাও করতে পারেনি! দু-মুঠো খাবারের তাগিদে রোনালদো স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে।

ছোট্ট বয়সেই অর্থ উপার্জনের জন্য বেচে নিলেন রাস্তা রাস্তায় ফুটবলের প্রতিযোগিতা চালানো। বেচে থাকার তাগিদে ফুটবলের মধ্যেই ভালোবাসা খুঁজে পান। সেটি রোনালদোর জীবনে সৌভাগ্যেও বয়ে আনে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই রোনালদো হয়ে যান স্থানীয় ক্লাবগুলোর নিয়মিত সদস্য! একসময় স্থানীয় ক্লাব সাও ক্রিস্তোভাওয়ে খেলার সময় ব্রাজিলের ঘরোয়া লীগের বিখ্যাত ক্লাব ক্রুইজেরোর নজরে আসেন। জীবনের গতিপথ পালটে যায় এখানেই।

২৫শে মে, ১৯৯৩ সালে মাত্র ১৬ বছর ৩ মাস ২০৩ দিন বয়সে 'মিনাস গেরিয়াস চ্যাম্পিয়ন্সশীপে' ক্যালডেন্সের সাথে পেশাদার ক্যারিয়ারে রোনালদোর অভিষেক হয়। রোনালদো প্রথম নজরে আসেন ৭ই নভেম্বর ১৯৯৩ সালে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব বাহিয়ার বিপক্ষে এক ম্যাচে একাই ৫ গোল করে! ম্যাচটি দেখে ব্রাজিলিয়ান জীবন্ত কিংবদন্তি ডিফেন্ডার কাফু বলেছিলেন,

"রোনালদোকে প্রথম দেখি ক্রুইজেরোর হয়ে খেলতে। সে তখনও অনেক ছোট ছিল! খেলায় সে একাই পাঁচ গোল করে এবং সে এটা দেখায় যে, একজন সত্যিকার নেতা। একজন ফেনোমেনন"

ক্রইজেরোর হয়ে প্রথম মৌসুমেই জিতে নেন ক্লাব ইতিহাসে প্রথম ব্রাজিলের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট কোপা ডে ব্রাজিল। কোপা ডে ব্রাজিল ক্রুইজেরোর হয়ে ১৪ ম্যাচ খেলে রোনালদো করেন সর্বোচ্চ ১২ গোল। ক্রুইজেরো হয়ে ৪৭ ম্যাচ খেলে করেন ৪৪টি গোল। এক বছর পর স্বদেশী কিংবদন্তি রোমারিওর পরামর্শে ক্রুইজেরোর পাঠ চুকে রোনালদো ইউরোপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন! পাড়ি দেন টোটাল ফুটবলের দেশ হল্যান্ডে। 

ইউরোপযাত্রা:

ইউরোপে রোনালদো দুই বছর খেলেন নেদারল্যান্ডসের ক্লাব পিএসভি আইগুহোভেনের হয়ে। ১৯৯৪-৯৬ এই দুই মৌসুম পিএসভির হয়ে অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলেন লিমা। ক্লাবের হয়েছে প্রথম মৌসুমেই ডাচ লীগে গোল করেন ৩০টি। ১৯৯৫ সালে ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোল করেন। 

পরের মৌসুমে জিতে নেন ডাচ কাপ। পিএসভির হয়ে পরে বছর উয়েফা কাপে জার্মান ক্লাব লেভারকুসেনের বিপক্ষে দারুণ এক গোল করে সবাইকে চমকে দেন। এই ম্যাচ পর রুডলফ বুলার বললেন,

"আমি কখনওই ১৮ বছর বয়সী কাউকে এভাবে খেলতে দেখিনি।”

পিএসভির হয়ে ৫৮ ম্যাচে করেন রেকর্ড ৫৪ গোল! মাত্র ২০ বছর বয়সে জিতেন সবচেয়ে কম বয়সে ফিফা বর্ষসেরার পুরষ্কার। পিএসভির হয়ে নজরকাড়া পার ফরম্যান্সের পর ইউরোপে ইন্টার ও বার্সেলোনার মত বড় ক্লাবগুলো ট্রান্সফার যুদ্ধে নামে রোনালদোকে দলে ভেড়াতে। অবশেষ ততকালীন রেকর্ড ১৭ মিলিয়নের বিনিময়ে পিএসভি থেকে বার্সেলোনায় যোগ দেন। বার্সেলোনায় যোগ দিয়ে প্রথম মৌসুমেই যা করলেন তা ছিলো অবিশ্বাস্য!

কাতালানদের হয়ে প্রথম মৌসুমে করেন ৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল। এখানে স্প্যানিশ লা লিগায়েই করেন সর্বোচ্চ ২৫ গোল। ন্যু ক্যাম্পের ক্লাবটির  হয়ে জিতেন উয়েফা কাপ, কোপা ডেল রে এবং সুপার কোপা ডি ইস্পানা।

১১ অক্টোবর ১৯৯৬ সাল, এসডি কম্পোস্টেলার সাথে দৃষ্টিনন্দন এক গোল করেন রোনালদো । ঐতিহাসিক গোলটির পর স্প্যানিশ পত্রিকা মার্কা শিরোনাম করে বসে, ‘পেলে রিটার্নস...’। পরবর্তীতে গোলটি নিয়ে স্পোর্টস জায়ান্ট নাইকির বিজ্ঞাপনে ভয়েসকভার করে প্রশ্ন করা হয়,

"Imagine you asked God to be the best player in the world, and he listened to you"

পরের মৌসুমেও রোনালদো লা লীগায় ৩৭ ম্যাচ খেলে করেন ৩৪ গোল। যা ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত রেকর্ড ছিল। টানা দ্বিতীয় বারের মত জিতেন ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কার।

১৯৯৭ সালে বার্সেলোনার সাথে চুক্তিনামায় সমস্যা হলে রোনালদো পাড়ি দেন ইতালিতে। রেকর্ড ১৯ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ইতালিয়ান জায়ান্ট ইন্টার মিলানে যোগ দেন। নেরাজ্জুরিদের ইতিহাসেরর প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা দুই বার ট্রান্সফার ফির ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েন রোনালদো। 

ইন্টারের হয়ে সেরি'আ লীগে প্রথম মৌসুমেই করেন সর্বোচ্চ ৩৭ ম্যাচে ২৫ গোল। প্রথমবারের মত জিতেন ব্যালন ডি'অর পুরষ্কার। নেস্তা থেকে মালদিনির মত কিংবদন্তি ডিফেন্ডাররা একবাক্যে বলেন-রোনালদো ছিল তখন অপ্রতিরোধ্য। ইন্টারের হয়ে অপ্রতিরোধ্য রোনালদো গোল করেন ৯৪ ম্যাচে ৫৯।  মূলত তখন থেকেই রোনালদোর নাম ইতালীয়ান পত্রিকাগুলোয়- 'এল ফেনোমেনন' পরিচিতি লাভ পায়। 

ওই সময় টাইমস অনলাইনে ইন্টারের সর্বকালের সেরা ২০ জন খেলোয়াড়ের একজন মনোনীত হোন রোনাল দো। ২০০২ সালে ইন্টার মিলান ছেড়ে রোনালদো যোগ দেন রাজকীয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে। প্রথম মৌসুমেই ২৩ গোল করে রিয়ালকে জিতালেন স্প্যানিশ লা লীগা।

রিয়ালের হয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও স্প্যানিশ সুপার কাপও জিতেছেন। ২০০৩-০৪ সিজনে ২৬ গোল করে হয়ে যান লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং জিতে নেন পিচিচি ট্রফি। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বারের মতো জিতেন ব্যালন ডি'অর পুরস্কার।

২০০৩ সালের ২৩শে এপ্রিলে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথম লেগে সান্তিয়াগো বার্না ব্যু'তে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও রিয়াল মাদ্রিদ। ওই ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ৪-৩ গোলে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে দেয়। কিন্তু দুই লেগ মিলিয়ে জয়ী হয় রিয়াল এবং টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পরে যায় ইউনাইটেড। 

রেড ডেভিলদের বাদ পড়ার পেছনের মূল হন্তাকারক ছিলেন রোনালদো। ওল্ড ট্রাফোর্ডে সেদিন রোনালদো একাই রিয়াল মাদ্রিদের হয় ৩ গোল করেন। অসাধারণ নৈপুণ্যে সেদিন প্রতিপক্ষ সমর্থকরাও বিমুগ্ধ হয়। তাই হ্যাট্রিক পূরণ করার পরে যখন রোনালদোকে বদলি করা হয় তখন ওল্ড ট্রাফোর্ডে স্বাগতিক সমর্থকরা-ই তাকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায়। 

প্রতিপক্ষের মাঠে এরকম অভিবাদন পাওয়া ফুটবল ইতিহাসে খুবই বিরল। ওই ম্যাচে রেড ডেভিলদের কাছ থেকে রোনালদোর দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা পাওয়া ছিলো রীতিমতো বিস্ময়কর ঘটনা। 

কেননা, সেদিন ম্যাচ শুরুর আগেই রোনালদোকে খোচা মেরে ইউনাইটেড কোচ ফার্গুসন বলেছিলেন, ‘রোনালদো চেয়েও ইউনাইটেডের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি রাহুল গঞ্জালেস।পরে রোনালদোর অতিমানবীয় পারফরম্যান্স মুগ্ধ হয়ে সেই স্যার ফার্গুসনই ম্যাচশেষে বলে ফেললেন, "You can’t legislate for someone who produces moments like that.”

রিয়াল মাদ্রিদে সকল প্রতিযোগিতায় ১২৭ ম্যাচ খেলে রোনালদো ৮৪ গোল করেন। ২০০৭ সালে রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে এবার ইতালির আরেক জায়ান্ট ক্লাব এসি মিলানে যোগ দেন। ক্যারিয়ারের পড়ন্তকালে শারীরিক অসুস্থতা ও প্রচন্ড ওজনজনিত সমস্যায় এসি মিলানের হয়ে খুব বেশি খেলতে পারেনি। 

দুই মৌসুমে রোজানারিওদের জার্সি গায়ে ২০ ম্যাচে ৯ গোল করেন। ২০০৮ সালে এসি মিলানে লিভোরনো ম্যাচে হাটুতে মারাত্মক আঘাত পেয়ে স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়েন রোনালদো। ওই মৌসুমেই রোনালদোর এসি মিলান ছেড়ে নিজ দেশের ক্লাব করিয়ান্থাসে যোগ দেন। নিজ দেশের ক্লাবের হয়ে ৩১ ম্যাচে ১৮ গোল করেন। ২০০৯ মৌসুমে রোনালদো করিয়ান্থাসের হয়ে ১২ ম্যাচে ৯ গোল করেন। ক্লাবের হয়ে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বারের মতো জিতেন কোপা ডি ব্রাজিল।

জাতীয় দল:

পৃথিবীর ইতিহাসে যেকজন ফুটবলার ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সমানভাবে সফল হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম রোনালদো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে খুব কম ফুটবলারই রোনালদোর মত এতটা সফল হয়েছেন। বিশ্বকাপ ও মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই সবজায়গায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ করেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র তিনজন ফুটবলার দুইটি ভিন্ন টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন। রোনালদো তাদের একজন। ফুটবলে মাত্র একজন খেলোয়াড়ই বিশ্বকাপের দুইটি ভিন্ন টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা খেলোয়াড় হয়ে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়েও দুইটি ভিন্ন টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। তিনিও রোনালদো লুইস দ্যা নাজারিও লিমা।

১৯৯৪ সালের ২৩শে মার্চ মাত্র ১৭ বছর বয়সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার সাথে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিল দলের হয়ে রোনালদোর অভিষেক হয়।৪ই মে, ১৯৯৪ সালে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদো ব্রাজিলের হয়ে প্রথম গোলের দেখা পান। সেই থেকে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে রোনালদো কিংবদন্তি পেলের পর সর্বোচ্চ ৯৮ ম্যাচে ৬২টি গোল করেন। কদিন আগে রোনালদোর সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন নেইমার।

বলা হয়ে থাকে, রোনালদোর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিলো নাকি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজের সেরা পারফরম্যান্স করা।  রোনালদো ছিলেন বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। ৯৭' এবং ৯৯’ দুই কোপা আমেরিকাই গোল করেছেন রোনালদো। ১৯৯৭ কোপা আমেরিকার সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। ৯৯'এর কোপা আমেরিকার হয়েছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ব্রাজিলের তিনটি আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ে দুবারই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়, দুবার সর্বোচ্চ গোলদাতা, একবার রানার্স আপ, এবং যে ৩টি ফাইনাল খেলেছেন তার প্রতেকটি আসরে রোনালদো গোল করেছেন। 

১৯৯৪ বিশ্বকাপের দলে রোনালদোর নাম থাকে! ৯৪' বিশ্বকাপে দলের সঙ্গে গিয়েছিলেনও যুক্তরাষ্ট্রে। তবে কোনো ম্যাচ না খেলেই সেবার বাড়ি ফিরেছিলেন তরুণ রোনালদো। ১৯৯৮-এর ফ্রান্স বিশ্বকাপেই রোনালদো গিয়েছিলেন একজন পরিপূর্ণ ফুটবলার হিসেবে। চার গোল করেছিলেন, করিয়েছিলেন ৩টি। ব্রাজিলের মোট ১৪ গোলের ৫০ শতাংশেই ছিলো রোনালদোর অবদান। 

যদিও সেবার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্ববাসী দেখেছিল এক ‘রহস্যময়ী’ রোনালদোকে। কোন অজানা কারণে রোনালদোর নিষ্প্রভ উপস্থিতি সেদিন ব্রাজিলকে বঞ্চিত করে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ-গৌরব থেকে। অনেকেই বলেন, ফাইনালের ঠিক আগমুহূর্তেই অজ্ঞাত কোন রোগে আক্রান্ত রোনালদো নাকি খেলেন  পুরোটাই আনফিট হয়ে। কিন্তু তাঁর প্রবল আগ্রহে কোচ মারিও জাগালো  তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন শুরুর একাদশে। রোনালদোর একদিনের ব্যর্থতাও ঠাঁই পেয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অমরত্বের অধ্যায়ে। রানার্স আপ হয়েও জিতেন আসরের সেরা খেলোড়ারের পুরস্কার।

অমরত্ব লাভ: 

২০০২ বিশ্বকাপে আর কোনো ছাড় দেননি রোনালদো। গোটা আসরে কেবল ইংল্যান্ড ছাড়া ব্রাজিলের প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছেন। সেমিফাইনালে তুরস্কের বিপক্ষে তাঁর একমাত্র গোলেই ফাইনাল নিশ্চিত করে ব্রাজিল। ফাইনালেও রোনালদোর জোড়া গোলে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় সেলেসাওরা।  

সেবার এশিয়ার বুকে বিশ্বকাপ ফাইনালে রোনালদো লিমা ও জার্মান কিংবদন্তি গোলরক্ষক অলিভার কানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক মুহুর্তগুলো একটি হিসেবে নিশ্চিতভাবেই জায়গা করে নিয়েছে। ইয়োকোহামা নিসানের মর্যাদার লড়াইয়ে কিংবদন্তি কানকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন রোনালদো। ব্রাজিলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পিছনে সর্বাধিক ৮ গোল করে আসরের গোল্ডেন বুট জিতেন। দুটো বিশ্বকাপেই মোট ১২ গোল করে পেলের সঙ্গে যৌথভাবে হয়ে যান ব্রাজিলিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা।

জার্মানিতে পরের বিশ্বকাপেও খেলেছেন। প্রথম দুই ম্যাচে ব্রাজিল জয় পেলেও কোনো গোল পাননি ‘মোস্ট কমপ্লিট স্ট্রাইকার' রোনালদো। কমে যাওয়া গতি আর বেড়ে যাওয়া স্বাস্থ্য নিয়ে তত দিনে শুরু হয়ে গেছে ফিসফাস। তবে নানা গুঞ্জন-সমালোচনার মধ্যেও কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা ঠিকই আস্থা রেখেছেন রোনালদোর ওপর। এই আস্থার প্রতিদান দিতেই যেন তৃতীয় ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে করেন দুই গোল। জার্ড মুলারের সঙ্গে যৌথভাবে হয়ে যান বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তিনটি বিশ্বকাপে গোল করা মাত্র ২০ জন ফুটবলারের ছোট্ট অথচ এলিট এক ক্লাবের সদস্যও বনে যান তিনি। দ্বিতীয় রাউন্ডে ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে গোলটি তাঁকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। 

জার্ড মুলারকে ছাড়িয়ে রোনালদো হয়ে যান বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের সাথে গোল করে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা ১৬ গোল করে রেকর্ডটি ভেঙ্গে দেন! রোনালদো জার্গেন ক্লিনসম্যানের পর ২য় ফুটবলার হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপের প্রতিটিতেই কমপক্ষে ৩টি করে গোল করার রেকর্ড করেন। পরে অবশ্য সেই ক্লোসা টানা তিন বিশ্বকাপে ৪ গোল করে  রেকর্ডটিও ভেঙ্গে দেন। রোনালদো ৪ বিশ্বকাপ খেলে ১৯ ম্যাচে ০.৭৯ গড়ে ২য় সর্বোচ্চ ১৫ গোল করেন। 

শেষকথা,

২০১১ সালের ৭ই জুন, ব্রাজিলের সাও পাওলোতে রোমানিয়ার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের বর্নাট্য ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানেন। বর্তমানে রোনালদো স্প্যানিশ লা লীগার রিয়াল ভ্যালদোলিদের হয়ে কাজ করছেন। ২০১৮ সালে ৩০ মিলিয়নের বিনিময়ে ক্লাবটির ৫১ শতাংশ মালিকানা কিনে নেন। তাঁর ইচ্ছে, ফুটবলে বড় অবদান রাখা। 

১৯৯৪-২০০২ বিশ্বের অগণিত মানুষকে ফুটবল অনুরাগী করতে রোনালদোর অবদানের কথা প্রথমেই আসবে। ফুটবল বিশ্বে রোনালদোর মত খুব কম খতরনাক স্ট্রাইকার জন্ম হয়েছে- যারা প্রতিপক্ষের প্রতি ইঞ্চি জায়গা ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের ফলাফল পালটে দিয়েছে, দুর্দান্ত সব ফিনিশিংয়ে একের পর এক গোল করেছে। সত্যিকথা বলতে, রোনালদো ছিলেন এমন এক ভয়ংকর স্ট্রাইকার যার নাম শুনলেই বিশ্বের কোটি কোটিন নব্বই দশক জন্ম নেওয়া প্রতিটি ফুটবল অনুরাগীদের রক্তে নাচন ধরে। তাই, সর্বকালের সেরা নাম্বার নাইনের তালিকায় তিনিই সেরা।

আজ ২২ সেপ্টেম্বর ৪৫ বছরে পদার্পণ করেছেন রোনালদো নাজারিও। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকারকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা। 

শুভ জন্মদিন, ‘আসল রোনালদো ’।

লেখা: এ.এইচ বাদশা