ফিচার

২০১৯ সাল, অ্যালিসন বেকার এবং একজন গোলরক্ষকের স্বপ্নের একটি বছর

এমন একটি বছর যার ক্যারিয়ারে আছে, তার চেয়ে বড় সৌভাগ্যবান সত্যিই আর কি কেউ আছে?  

ডেস্ক রিপোর্ট

২ অক্টোবর ২০২২, দুপুর ২:৬ সময়

[ Screenshot_20221002-135904_Gallery.jpg ]

২০১৮ সাল, চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল, কিয়েভ। পুরো আসর জুড়ে জার্মান মাস্টারমাইন্ড ইয়ুর্গেন ক্লপের গেগেনপ্রেসিং ফুটবলের উপর ভর করে অসাধারণ ফুটবল খেলে প্রায় ১৩ বছর পর ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের ফাইনালে উঠে লিভারপুল।

ফাইনালে লিভারপুলের প্রতিপক্ষ হয় আসরের সর্বোচ্চ ১২ বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ। উত্তেজনা ঠাসা ম্যাচে শুরুতে রিয়াল মাদ্রিদকে কাঁপিয়ে দেয় অলরেড। স্প্যানিশ দলটির অগোছালো ফুটবলের সুযোগ নিয়ে একের পর এক আক্রমণে করে রক্ষণের কঠিন পরীক্ষা নেয় ক্লপ শিষ্যরা। তবে, কোনভাবে আক্রমণের ঝাপটে সামলে নেয় মার্সেলো-রামোস- কার্ভাহাল-ভারানেরা।

ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ লিভারপুলের হাতে ছিল, কিন্তু দিন শেষে হাসি ফুটে লস ব্লাংকোস শিবিরে। তবে কেন? অলরেডদের হারের একটিই কারণ- গোলরক্ষক লরিস কারিয়ুসের কিছু হাস্যকর, শিশুসুলভ এবং অমার্জনীয় ভুল। জার্মান গোলরক্ষক কিছু হাস্যকর ভুলে ইউরোপ সেরা হওয়ার খুব কাছে গিয়েও রিয়াল মাদ্রিদের কাছে শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলে হেরে খালি হাতে ফিরতে হয় মার্সেসাইডবাসীদের।

সেদিন কারিয়ুস ঠিক কতটা ভুল করেছিলেন তা বুঝতে ওয়েলস তারকা গ্যারেথ বেলের শেষ গোল করার পর ধারাভাষ্যকারের মজার কথা শুনলেই বুঝা যায। মজার ছলে হাসতে হাসতে একসময় তিনি বলেই ফেললেন, “উফফফ! কি মজাদার গোল!”

মহাদেশীয় সেরা হওয়ার এতটা কাছে এসেও এমনই বিষাদময় বিদায় মেনে নিতে পারেননি কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। এরপর পরের বছরই আবার নিজের লক্ষ্যে ঠিক করেন। এবার স্কোয়াডের গভীরতা আনতে লিভারপুল ম্যানেজমেন্টকে অনুরোধ করেন।

গোলবারের নিচে যে বিশ্বস্ত সৈনিকের অভাবে কিয়েভ থেকে খালি হাতে ফিরতে হয় লিভারপুলকে, এবার তাঁর নিচে পাহারা দিতে ইয়ুর্গেন ক্লপের চোখ পড়ে ইতালিয়ান ক্লাব রোমার হয়ে দারুণ সময় পার করা ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের দিকে।

অ্যালিসন বেকার মূলত চ্যাম্পিয়নস লীগে বার্সেলোনাকে বিদায় করেই ইউরোপীয়ান জায়ান্ট ক্লাবদের নজরে চলে আসেন। দুর্ভাগা ক্লপ এবার একটুও দেরী না করেই লিভারপুলের গোলবার পাহারা দেওয়ার জন্য এএস রোমা থেকে ক্লাব রেকর্ড প্রায় ৬৬.৮মিলিয়ন বিনিময়ে উড়িয়ে নিয়ে আসেন এলিসনকে।

১২ই আগষ্ট ‘১৮  ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে ওয়েস্ট হাম ইউনাইটেডের সাথে লিভারপুলের হয়ে অ্যালিসনের অভিষেক হয়। সেই শুরু। অ্যানফিল্ডের ক্লাবটির হয়ে আর পিছে তাকাতে হয়নি ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষকের। সেদিন থেকেই অ্যালিসন বেকার ও লিভারপুল একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

একজন গোলরক্ষকের স্বপ্নের বছর বলতে আমরা আসলে কি বুঝি? একজন তারকা গোলরক্ষক স্বাভাবিকভাবে একটি বড় ক্লাবে খেলবেন। প্রথম তিনি ওই ক্লাবের সেরা গোলরক্ষক হতে চাইবেন। তারপরে তার ক্লাব যে লীগে খেলে সেই লীগের সেরা গোলরক্ষক হওয়ার চেষ্টা করবেন। ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের সেরা গোলরক্ষক হওয়া স্বপ্ন দেখবেন।

জাতীয় দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হবেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সেরা গোলরক্ষক হতে চাইবেন। বছর শেষে ব্যক্তিগতভাবে ক্লাবে ও জাতীয় দলের হয়ে সম্ভব্য সব বড় প্রতিযোগিতায় সেরা দলে নিজের জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

তারপর কি করবে? তারপর উয়েফা বর্ষসেরা ও ফিফা বর্ষসেরা গোলরক্ষক হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করবেন। একজন গোলরক্ষক তার  দেশের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন। একজন সেরা গোলরক্ষকের এক বছরে এর চেয়েও বেশি কিছু পাওনা আছে?

অবাক হলেও সত্য, ব্রাজিলের সেনসেশন গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার ২০১৯ সালে লিভারপুলের হয়ে প্রথম মৌসুমেই এই সবকিছুই করেছেন। হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। ২০১৯ সালে লিভারপুলের হয়ে একজন গোলরক্ষকের স্বপ্নের স্বপ্নের প্রায় সম্ভব্য সবকিছু জিতেছেন অ্যালিসন বেকার।

ফুটবল ইতিহাসে প্রথম গোলরক্ষক হিসেবে এক মৌসুমেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ গোল্ডেন গ্লাভস,  চ্যাম্পিয়নস লীগ গোল্ডেন গ্লাভস, উয়েফার বর্ষসেরা গোলরক্ষক, ফিফা বর্ষসেরা গোলরক্ষক, গোলরক্ষকদের ব্যালন ডি’অর খ্যাত ‘লেভ ইয়াসীন এওয়ার্ড’-সহ একজন গোলরক্ষকের সম্ভব্য সব ব্যক্তিগত পুরস্কার একাই জিতেছেন লিভারপুলে হয়ে অভিষেক মৌসুমে।

জাতীয় দল ব্রাজিলের হয়েও জিতেছেন মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয় কোপা আমেরিকা গোল্ডেন গ্লাভস ও কোপা আমেরিকা সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার। শুধু তাই নয়, ইতিহাসের প্রথম ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক হিসেবে একই বছর জিতেছেন ব্রাজিলের বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার গোল্ড এওয়ার্ড।

পাঠক, এতকিছু যিনি এক মৌসুমেই জিতেছেন তার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ঠিক কেমন ছিল এতক্ষণে তা জানার আগ্রহও এখন নিশ্চয়ই জেছে। ২০১৯ সালটা কেমন আসলে ছিল অ্যালিসন বেকারের? কি কারণে একজন গোলকিপারের স্বপ্নের সকল ব্যক্তিগত অর্জন এক মৌসুমেই নিজের করে নিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান এই সেনসেশন গোলরক্ষক? চলুন পরিসংখ্যানে আলোকে তা একবার জেনে নেওয়া যাক।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগঃ

২০১৮/১৯ মৌসুম ছিল অ্যালিসনের ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম। এই মৌসুমে ইপিএলে ৩৮ ম্যাচ খেলে ২১ ম্যাচে নিজেদের জাল অক্ষত রেখেছেন রেখেছেন। যেখানে ৩০ ম্যাচই জিতেছে লিভারপুল। মৌসুমে প্রিমিয়ার লীগে অ্যলিসন সেভ করছে অবিশ্বাস্য ৭৬টি। গোল হজম করেছেন মাত্র ২৭টি। একটি আত্মঘাতী গোলও হজম করেননি। সেই মৌসুমে ইপিএলে অ্যালিসন সুইপার ক্লিয়ারনেস করছে প্রায় ১৭টি। বল পাঞ্চও করে ১৭টি। পুরো মৌসুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে প্রিমিয়ার লীগে বর্ষসেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বটে, প্রিমিয়ার লীগ গোল্ডেন গ্লাভসও নিজের করে নিয়েছেন।

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ:

আগেরবার গোলরক্ষকের হাস্যকর ভুলে চ্যাম্পিয়নস লীগ হাতছাড়া হলেও এবার ঠিকই চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতে নেয় লিভারপুল। লিভারপুলের চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন অ্যালিসন বেকার। অনেকের মতে গ্রুপপর্বে  নাপোলির বিপক্ষে ম্যাচের ঠিক ৯০তম মিনিটে অ্যালিসন অবিশ্বাস্য সেই সেভটি না দিলে গ্রুপপর্বই হয়তো পার হতে পারতো না লিভারপুল।

চ্যাম্পিয়নস লীগে ১৩ ম্যাচে ১১৭০ মিনিট খেলে ৬ ম্যাচেই ক্লিনশীট রেখেছেন। ১৩ ম্যাচে ৩২টি সেভ দিয়ে গোল হজম করেন ১১টি। ফাইনালে ম্যাচেও ক্লিনশিট রেখেছেন। মহাগুরুত্বপূর্ণ সেই ম্যাচে ডেলে আলি, সন, এরিকসন, হ্যারি কেইনদের ৫টি শর্টস অন টার্গেট একাই ঠেকিয়ে দিয়েছেন। ফলাফল, উয়েফার বর্ষসেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। সাথে উয়েফা গোল্ডেন গ্লাভস ও জিতেছেন। এবং অবশ্য উয়েফা টিম অব দ্য ইয়ারে জায়গা করে নিয়েছেন।

ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ:

প্রথমবারের মত লিভারপুলের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জয়েও অ্যালিসন বেকারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।  ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল দুই ম্যাচে ১৪টির মত সেভ করেছেন। ফাইনালে নিজের স্বদেশী ক্লাব ফ্ল্যামেংগোর স্বদেশি ফুটবলার গ্যাব্রিয়েল বারবোসা, হেনরিকদের ৮টি শট একা ঠেকিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অ্যালিসন বেকারের পারফরম্যান্সে ভর করেই প্রথমবারের মত ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে লিভারপুল।

কোপা আমেরিকা:

২০১৯ সালে ক্লাবের ন্যায় জাতীয় দল ব্রাজিলের হয়েও দারুণ উজ্জ্বল ছিলেন অ্যালিসন বেকার। ব্রাজিলের নবম কোপা আমেরিকা জয়ে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ঘরের মাঠে মহাদেশীয় লড়াইয়ে শেষ চার পর্যন্ত কোন গোল হজম না করেই নিজেদের জাল অক্ষত রেখেছেন।

আসরের ফাইনালে পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোলটি হজম করেছেন। সবমিলিয়ে কোপা আমেরিকা ৬ ম্যাচে ৫টিতেই নিজের জাল অক্ষত রেখে শিরোপা জয়ের পাশাপাশি আসরের সেরা গোলরক্ষকের সাথে গোল্ডেন গ্লাভসটিএ নিজের করে নিয়েছেন।

২০১৯ সাল। ব্যক্তিগতভাবে এই একটি বছরেই এলিসন বেকার যা যা জিতেছেন অনেক গোলরক্ষকের পুরো ক্যারিয়ারেও তার অর্ধেক জিততে পারেননি। সেই বছর একজন গোলরক্ষকের সম্ভব্য সবকিছু তো জিতেছেনই একই সাথে ফিফার ফিফপ্রো একাদশ, উয়েফা বর্ষসেরা একাদশ, প্রিমিয়ার লিগ বর্ষসেরা একাদশ, ক্লাব বিশ্বকাপ সেরা একাদশেও জায়গা পেয়েছেন।

একই সাথে কোপা আমেরিকার সেরা একাদশেও নিশ্চিতভাবেই নিজের জায়গাও পোক্ত করেছেন। তা ছাড়াও ওয়ার্ল্ড সকার এওয়ার্ড বর্ষসেরা গোলরক্ষক, গোল ডট কম সেরা গোলরক্ষক, IFFHS  ছেলেদের বর্ষসেরা গোলরক্ষক ও ফিফা ব্যালন ডি’অরে সপ্তমসহ অসংখ্য এওয়ার্ড জিতেছেন। এমন একটি বছর যার ক্যারিয়ারে আছে, তার চেয়ে বড় সৌভাগ্যবান সত্যিই আর কেউ আছে?

নান্দনিক ফুটবলের অন্য নাম ব্রাজিল; আক্রমণাত্মক ফুটবলই যাদের শেষ কথা। কিন্তু ছন্দ আর আক্রমণই ফুটবলের সব নয়। পরিপূর্ণ ম্যাচ জিততে আরও কিছু লাগে। সেটির নাম? ইস্পাত কঠিন রক্ষণ। আরও স্পষ্ট করে বললে গোলরক্ষক। কিন্তু, ব্রাজিলের গোলরক্ষক ভাগ্য বরাবরই নিষ্ঠুর। যুগে যুগে আউটফিল্ডে একের পর এক প্রতিভা উপহার দেওয়া ব্রাজিল দলে কখনই ভালো গোলরক্ষকের এত ভিড় ছিলনা যা কিনা এখন আছে।

একটু হিসাব করে দেখা যায়, কোন বিশ্বকাপেই ব্রাজিল একাধিক বিশ্বমানের গোলরক্ষক দলে পায় নাই। ১৯৯০ তে ছিল তাফারেল, ১৯৯৪ তেও সেই তাফারেল, ১৯৯৮তে তাফারেলে সাথে উঠতি দিদা, ২০০২ সালে মার্কোস, ২০০৬ সালে তার সাথে উঠতি হুলিও সেজার, ২০১০ আর ঘরের মাঠে ২০১৪’তে হুলিও সেজার। একাধিক তারকা গোলরক্ষক ব্রাজিলে কখনওই ছিল না।

এবারই প্রথম সেলেসাওদের ভাগ্য বদলেছে। ব্রাজিলে এখন অ্যালিসন বেকারের মতো বিশ্বমানে গোলরক্ষক আছেন, আবার তাঁকে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে এদারসন নেতোদের মত বিশ্বমানের গোলরক্ষকও ভিড় করেছে।

এত গোলরক্ষক মাঝেও অ্যালিসন বেকার স্বমহিমায় অনন্য। তাই সাবেক গোলরক্ষক তাফারেলই বলেছেন, “অ্যালিসন গোলরক্ষদের পেলে।” রোমা কোচও বলেন, “এলিসন গোলকিপারদের মেসি।” ইয়ুর্গেন ক্লপের মতে, “তার দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার।” তিতের মতে, “ওয়ান ম্যান আর্মি।”

তাফারেলের চোখে পেলে, রোমা কোচের কাছে মেসি কিংবা তিতের কাছে ওয়ান ম্যান আর্মি- অ্যালিসন বেকার যাই হোক, ব্রাজিল বহু বছর পরে একজন পরিপূর্ণ গোলরক্ষক পেয়েছে এই কথা সবাই মেনে নিয়েছে।

যেভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশায় মত্ত আছেন লিভারপুল গোলরক্ষক, তাঁর সামনে প্রচন্ড সুযোগ আছে ব্রাজিলের গোলরক্ষক পজিশনে নিয়ে যাওয়ার। অ্যালিসন বেকার নিজেও বিষয়টি জানেন বলে বিশ্বাস। নিজেকে আরও ছাড়িয়ে যাবে অ্যালিসন বেকার-এমনাই আশা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের।

কাতার বিশ্বকাপের সেলেসাওদের গোলবারের নিচের ভরসার প্রতীক আজ ৩০তম জন্মদিনে পদার্পণ করলেন।

শুভ জন্মদিন,  অ্যালিসন বেকার। 

লেখা: এ.এইচ বাদশা।